4:08 pm, Saturday, 12 September 2026

হোমল্যান্ড লাইফে ভয়াবহ আর্থিক সংকট-গ্রাহকের টাকা ফেরতের আগেই পরিচালকরা কি বিদেশে পাড়ি দেবেন?

140

দায় প্রায় ৬০০ কোটি, গ্রাহকের পাওনা ২০০ কোটি; সরকারের কর পাওনা ১৩০ কোটি টাকা
৪১ কোটি টাকার এফডিআর ঘিরে তৎপরতা, নতুন এমডি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
বিতর্কিত আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে নিয়োগের চিঠি প্রকাশ—জরুরি হস্তক্ষেপ চান গ্রাহক-কর্মীরা

১৯৯৬ সালে একই সময়ে যাত্রা শুরু করেছিল দুটি জীবনবীমা প্রতিষ্ঠান—মেঘনা লাইফ ও হোমল্যান্ড লাইফ। সময়ের ব্যবধানে একটি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, সম্পদ ও বিনিয়োগ সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারলেও দীর্ঘদিনের মালিকানা দ্বন্দ্ব, পরিচালনা পর্ষদের বিরোধ, ব্যবস্থাপনা সংকট ও নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স এখন গভীর আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কোম্পানিটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে পাওয়া নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের মোট দায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের পাওনা প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী সরকারের পাওনা করের পরিমাণও প্রায় ১৩০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে কোম্পানির হাতে থাকা প্রায় ৪১ কোটি টাকার এফডিআর ঘিরে পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে আরও জটিলতা।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ এবং কোম্পানির দায় নিষ্পত্তির আগে কয়েকজন পরিচালক শেয়ার বিক্রি করে নিজেদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি দেশে থাকা কিছু পরিচালক বিদেশে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

হোমল্যান্ড লাইফের সংকট এখন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বিরোধের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার গ্রাহকের সঞ্চয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা।

প্রশ্ন উঠেছে—কোম্পানির দায় যেখানে শত শত কোটি টাকা, সেখানে গ্রাহকের পাওনা নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার শেয়ার বিক্রি করে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী ব্যবস্থা নেবে?

আর যদি কোনো পরিচালক সত্যিই গ্রাহকের পাওনা ও কোম্পানির দায় এড়িয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আগেভাগে যাচাই করবে কি না—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

হোমল্যান্ড লাইফের প্রায় ৪১ কোটি টাকার এফডিআর এখন আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

এ অভিযোগ সত্য কি না, তা তদন্তের বিষয়। তবে গ্রাহকদের পাওনা যেখানে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে কোম্পানির হাতে থাকা ৪১ কোটি টাকার এফডিআর কীভাবে সংরক্ষণ, পরিচালনা ও ব্যবহার করা হচ্ছে—এ বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

এফডিআরের মালিকানা, ব্যাংক হিসাব, মেয়াদ, নমিনি, উত্তোলনের ক্ষমতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

হোমল্যান্ড লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাবেক এমডি বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মালিকপক্ষের একটি অংশের অসহযোগিতার কারণে তিনি প্রত্যাশিতভাবে কাজ করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে আব্দুল মতিনকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়। তার যোগ্যতা ও সার্টিফিকেট নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সার্টিফিকেট-সংক্রান্ত মামলায় তার দণ্ডের বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এরপর আওয়ামী লীগ নেতা আসলাম রেজাকে এমডি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে কোম্পানির কর্মকর্তা ও পরিচালকদের একাংশের বিরোধিতায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি বলে জানা যায়।

পরে বীমা খাতের কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধানের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

হোমল্যান্ড লাইফের ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শাহাদাত হোসেনের অভিযোগ, বোর্ডের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাকে কোনো বেতন-ভাতা বা কমিশন দেওয়া হয়নি।

তার দাবি, তিনি দায়িত্ব পালনকালে কোম্পানির স্বার্থে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তাকে বাদ দিয়ে নতুন এমডি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে এমডি করার উদ্যোগ কেন?

এর মধ্যেই নতুন করে আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক করার প্রক্রিয়া সামনে এসেছে।

১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মানবসম্পদ বিভাগের শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে নিয়োগ দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তার সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে।

এই নিয়োগকে ঘিরেই এখন বড় প্রশ্ন—আগের নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা বিরোধ নিয়ে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যক্রম চলমান থাকলে নতুন নিয়োগের আগে সেগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না?

একই সঙ্গে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, পূর্ববর্তী চাকরির রেকর্ড, নিয়োগের বৈধতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন—সবকিছু যাচাই করা হয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

হোমল্যান্ড লাইফের পরিচালকদের বিরোধ, এমডি নিয়োগ, আর্থিক সংকট ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কিন্তু এত অভিযোগ ও প্রশ্ন ওঠার পরও কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি হয়েছে কি না—এখন সেটিই গ্রাহকদের প্রধান প্রশ্ন।

স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন কোম্পানিটির—

– মোট সম্পদ ও দায়;
– গ্রাহকদের প্রকৃত পাওনা;
– ব্যাংক হিসাব;
– এফডিআর;
– বিনিয়োগ;
– বীমা তহবিল;
– পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন;
– সাম্প্রতিক শেয়ার হস্তান্তর;
– ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বৈধতা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টদের দাবি, গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরুরি ভিত্তিতে কোম্পানিটির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও প্রশাসনিক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ৪১ কোটি টাকার এফডিআরসহ কোম্পানির সব ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগের বর্তমান অবস্থা যাচাই, সম্পদ ও দায়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত এবং সাম্প্রতিক শেয়ার হস্তান্তর ও পরিচালক পরিবর্তনের বিষয়গুলো পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।

কোনো পরিচালক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি কোম্পানির দায় এড়িয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন কি না—এ অভিযোগও আইন অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হোমল্যান্ড লাইফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সবকিছুই সত্য—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগগুলোর ধরন এবং অর্থের পরিমাণ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই না করে উপেক্ষা করাও ঝুঁকিপূর্ণ।

কারণ এখানে শুধু একটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন রয়েছে হাজার হাজার মানুষের সঞ্চয়, গ্রাহকের ভবিষ্যৎ এবং বীমা খাতের প্রতি আস্থার।

তাই সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি—কোম্পানির আর্থিক অবস্থা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, এফডিআর, ব্যাংক হিসাব ও শেয়ার লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। একই সঙ্গে এমডি নিয়োগের বৈধতা ও পরিচালকদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে।

গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের আগে যদি পরিচালকরা নিজেদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারেন, তাহলে হাজার হাজার গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

আর আজ যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা না নেয়, আগামীকাল পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সেই দায় নেবে কে?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

আশুলিয়ায় ‘মমতা স্বেচ্ছায় রক্তদান ফাউন্ডেশন’-এর শুভ উদ্বোধন

হোমল্যান্ড লাইফে ভয়াবহ আর্থিক সংকট-গ্রাহকের টাকা ফেরতের আগেই পরিচালকরা কি বিদেশে পাড়ি দেবেন?

Update Time : 02:27:20 pm, Friday, 14 August 2026
140

দায় প্রায় ৬০০ কোটি, গ্রাহকের পাওনা ২০০ কোটি; সরকারের কর পাওনা ১৩০ কোটি টাকা
৪১ কোটি টাকার এফডিআর ঘিরে তৎপরতা, নতুন এমডি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
বিতর্কিত আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে নিয়োগের চিঠি প্রকাশ—জরুরি হস্তক্ষেপ চান গ্রাহক-কর্মীরা

১৯৯৬ সালে একই সময়ে যাত্রা শুরু করেছিল দুটি জীবনবীমা প্রতিষ্ঠান—মেঘনা লাইফ ও হোমল্যান্ড লাইফ। সময়ের ব্যবধানে একটি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, সম্পদ ও বিনিয়োগ সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারলেও দীর্ঘদিনের মালিকানা দ্বন্দ্ব, পরিচালনা পর্ষদের বিরোধ, ব্যবস্থাপনা সংকট ও নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স এখন গভীর আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কোম্পানিটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে পাওয়া নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের মোট দায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের পাওনা প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী সরকারের পাওনা করের পরিমাণও প্রায় ১৩০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে কোম্পানির হাতে থাকা প্রায় ৪১ কোটি টাকার এফডিআর ঘিরে পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে আরও জটিলতা।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ এবং কোম্পানির দায় নিষ্পত্তির আগে কয়েকজন পরিচালক শেয়ার বিক্রি করে নিজেদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি দেশে থাকা কিছু পরিচালক বিদেশে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

হোমল্যান্ড লাইফের সংকট এখন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বিরোধের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার গ্রাহকের সঞ্চয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা।

প্রশ্ন উঠেছে—কোম্পানির দায় যেখানে শত শত কোটি টাকা, সেখানে গ্রাহকের পাওনা নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার শেয়ার বিক্রি করে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী ব্যবস্থা নেবে?

আর যদি কোনো পরিচালক সত্যিই গ্রাহকের পাওনা ও কোম্পানির দায় এড়িয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আগেভাগে যাচাই করবে কি না—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

হোমল্যান্ড লাইফের প্রায় ৪১ কোটি টাকার এফডিআর এখন আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

এ অভিযোগ সত্য কি না, তা তদন্তের বিষয়। তবে গ্রাহকদের পাওনা যেখানে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে কোম্পানির হাতে থাকা ৪১ কোটি টাকার এফডিআর কীভাবে সংরক্ষণ, পরিচালনা ও ব্যবহার করা হচ্ছে—এ বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

এফডিআরের মালিকানা, ব্যাংক হিসাব, মেয়াদ, নমিনি, উত্তোলনের ক্ষমতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

হোমল্যান্ড লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাবেক এমডি বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মালিকপক্ষের একটি অংশের অসহযোগিতার কারণে তিনি প্রত্যাশিতভাবে কাজ করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে আব্দুল মতিনকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়। তার যোগ্যতা ও সার্টিফিকেট নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সার্টিফিকেট-সংক্রান্ত মামলায় তার দণ্ডের বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এরপর আওয়ামী লীগ নেতা আসলাম রেজাকে এমডি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে কোম্পানির কর্মকর্তা ও পরিচালকদের একাংশের বিরোধিতায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি বলে জানা যায়।

পরে বীমা খাতের কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধানের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

হোমল্যান্ড লাইফের ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শাহাদাত হোসেনের অভিযোগ, বোর্ডের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাকে কোনো বেতন-ভাতা বা কমিশন দেওয়া হয়নি।

তার দাবি, তিনি দায়িত্ব পালনকালে কোম্পানির স্বার্থে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তাকে বাদ দিয়ে নতুন এমডি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে এমডি করার উদ্যোগ কেন?

এর মধ্যেই নতুন করে আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক করার প্রক্রিয়া সামনে এসেছে।

১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মানবসম্পদ বিভাগের শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে নিয়োগ দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তার সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে।

এই নিয়োগকে ঘিরেই এখন বড় প্রশ্ন—আগের নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা বিরোধ নিয়ে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যক্রম চলমান থাকলে নতুন নিয়োগের আগে সেগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না?

একই সঙ্গে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, পূর্ববর্তী চাকরির রেকর্ড, নিয়োগের বৈধতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন—সবকিছু যাচাই করা হয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

হোমল্যান্ড লাইফের পরিচালকদের বিরোধ, এমডি নিয়োগ, আর্থিক সংকট ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কিন্তু এত অভিযোগ ও প্রশ্ন ওঠার পরও কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি হয়েছে কি না—এখন সেটিই গ্রাহকদের প্রধান প্রশ্ন।

স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন কোম্পানিটির—

– মোট সম্পদ ও দায়;
– গ্রাহকদের প্রকৃত পাওনা;
– ব্যাংক হিসাব;
– এফডিআর;
– বিনিয়োগ;
– বীমা তহবিল;
– পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন;
– সাম্প্রতিক শেয়ার হস্তান্তর;
– ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বৈধতা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টদের দাবি, গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরুরি ভিত্তিতে কোম্পানিটির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও প্রশাসনিক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ৪১ কোটি টাকার এফডিআরসহ কোম্পানির সব ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগের বর্তমান অবস্থা যাচাই, সম্পদ ও দায়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত এবং সাম্প্রতিক শেয়ার হস্তান্তর ও পরিচালক পরিবর্তনের বিষয়গুলো পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।

কোনো পরিচালক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি কোম্পানির দায় এড়িয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন কি না—এ অভিযোগও আইন অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হোমল্যান্ড লাইফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সবকিছুই সত্য—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগগুলোর ধরন এবং অর্থের পরিমাণ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই না করে উপেক্ষা করাও ঝুঁকিপূর্ণ।

কারণ এখানে শুধু একটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন রয়েছে হাজার হাজার মানুষের সঞ্চয়, গ্রাহকের ভবিষ্যৎ এবং বীমা খাতের প্রতি আস্থার।

তাই সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি—কোম্পানির আর্থিক অবস্থা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, এফডিআর, ব্যাংক হিসাব ও শেয়ার লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। একই সঙ্গে এমডি নিয়োগের বৈধতা ও পরিচালকদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে।

গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের আগে যদি পরিচালকরা নিজেদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারেন, তাহলে হাজার হাজার গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

আর আজ যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা না নেয়, আগামীকাল পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সেই দায় নেবে কে?