1:56 pm, Saturday, 12 September 2026

অটোরিকশা: জনজীবনের আশীর্বাদ, নাকি সড়কের অভিশাপ?

109

বাংলাদেশের কোনো শহর, উপজেলা কিংবা গ্রামাঞ্চলের ব্যস্ত সড়কে দাঁড়ালে একটি দৃশ্য খুব সহজেই চোখে পড়ে—অটোরিকশার সারি। কোথাও সিএনজিচালিত অটোরিকশা, কোথাও ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা বা ইজিবাইক, কোথাও আবার স্থানীয়ভাবে তৈরি নানা ধরনের তিন চাকার যান। শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তা—সর্বত্রই এদের উপস্থিতি।

কেউ অটোরিকশাকে দেখেন যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে, কেউ দেখেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার অপরিহার্য বাহন হিসেবে। বাস্তবতা হলো, দুটো কথাই সত্য।

অটোরিকশা বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার একটি সমস্যা—কিন্তু একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু, “অটোরিকশা বন্ধ করা হবে কি না?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহনব্যবস্থার অংশে পরিণত করা যায়?

যে বাহনটি দরিদ্র মানুষের কাছে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন

বাংলাদেশের গণপরিবহনব্যবস্থা এখনো এমন নয় যে প্রতিটি মানুষ তার বাড়ির কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য বাস, ট্রেন বা অন্য কোনো গণপরিবহন পেয়ে যাবে। বিশেষ করে গ্রাম, উপজেলা, মফস্বল শহর এবং বড় শহরের গলি-মহল্লায় অটোরিকশা অনেক সময় শেষ মাইলের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

একজন কৃষক গ্রামের বাড়ি থেকে বাজারে যাচ্ছেন, একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, একজন রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, একজন শ্রমিক কর্মস্থলে যাচ্ছেন—তাদের অনেকের জন্য অটোরিকশা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বাস্তব প্রয়োজন।

ঢাকার মতো যানজটপূর্ণ শহরেও স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে রিকশা ও অটোরিকশার গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। কারণ বড় গণপরিবহনের রুট যেখানে শেষ হয়, অনেক সময় সেখান থেকেই অটোরিকশার যাত্রা শুরু হয়। এটি মানুষের বাড়ি, বাজার, কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রের সঙ্গে প্রধান সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে।

আর এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।

মুখে আমরা অনেকেই অটোরিকশার সমালোচনা করি, যানজটের জন্য তাকে দায়ী করি, চালকের আচরণ নিয়ে অভিযোগ করি; কিন্তু নিজের যাতায়াতের প্রয়োজনে সেই অটোরিকশাতেই উঠে বসি। কেন?

কারণ বাস্তব জীবনে মানুষকে শুধু আদর্শ পরিবহনব্যবস্থা দিয়ে চলতে হয় না; তাকে সময়, দূরত্ব ও খরচের হিসাবও করতে হয়। প্যাডেল রিকশার তুলনায় অটোরিকশা অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত, চালকের কায়িক শ্রম তুলনামূলক কম এবং স্বল্প দূরত্বে এর ভাড়াও অনেক মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।

অর্থাৎ অটোরিকশার চালিকাশক্তি শুধু চালক নন—যাত্রীদের চাহিদাও এর বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ।

মানুষ যদি এ বাহন ব্যবহার না করত, তাহলে দেশের শহর-গ্রামজুড়ে এত বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার বিস্তার ঘটত না।

তাই অটোরিকশাকে শুধু “রাস্তার যান” হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো।

অটোরিকশা শুধু যাত্রী বহন করে না, জীবিকাও বহন করে

একটি অটোরিকশার স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসে থাকা মানুষটির দিকে আমরা অনেক সময় তাকাই না। কিন্তু তার পেছনে একটি পরিবার থাকে।

একজন চালকের আয় দিয়ে সংসার চলে, সন্তানের পড়াশোনা হয়, বাড়িভাড়া দেওয়া হয়, বাজার হয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে গ্যারেজ মালিক, মেকানিক, যন্ত্রাংশ বিক্রেতা, ব্যাটারি ব্যবসায়ী, চার্জিং স্টেশনের কর্মী, গাড়ি তৈরির কারিগর এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিস্তার পরিবহন খাতে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। অনেক মানুষের কাছে এটি আনুষ্ঠানিক চাকরির বিকল্প হিসেবে জীবিকার পথ খুলে দিয়েছে।

সুতরাং অটোরিকশা নিয়ে নীতি নির্ধারণের সময় শুধু যানবাহনের সংখ্যা গুনলে হবে না; মানুষের জীবিকার হিসাবও করতে হবে।

একটি অটোরিকশা বন্ধ করা মানে শুধু একটি যান রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। এর অর্থ হতে পারে একটি পরিবারের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়া।

তাই নিয়ন্ত্রণ চাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নামে হঠাৎ জীবিকা ধ্বংস করা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।

কিন্তু এখানেই আসে বড় প্রশ্ন—নিরাপত্তার দায় নেবে কে?

অটোরিকশার ইতিবাচক দিক যতই থাকুক, এর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে তৈরি ও পরিচালিত হয়েছে। সব যান একই মানের নয়, সব চালকের প্রশিক্ষণও একই নয়। কোথাও পুরোনো রিকশার কাঠামোর সঙ্গে মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করে তুলনামূলক বেশি গতির যান তৈরি করা হয়েছে।

সমস্যাটি এখানেই।

যে কাঠামো একটি ধীরগতির প্যাডেল রিকশার জন্য তৈরি, সেটিতে মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করে গতি বাড়ালেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না। যানটির ব্রেক, চাকা, চেসিস, স্টিয়ারিং, আলো, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং ব্যাটারি স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মান থাকা জরুরি।

স্বল্পগতির স্থানীয় যাতায়াতের জন্য উপযোগী এসব যানকে মহাসড়ক বা দ্রুতগতির সড়কে চালানোও ঝুঁকিপূর্ণ।

তাই এখানে শুধু চালককে দোষ দিলে সমস্যার মূল কারণ ধরা পড়বে না।

নিরাপদ যান তৈরি না করে, চালককে প্রশিক্ষণ না দিয়ে, নিবন্ধন না করে এবং সঠিক রাস্তা নির্ধারণ না করে শুধু চালককে শাস্তি দেওয়া সমস্যার অর্ধেক সমাধান মাত্র।

মহাসড়ক আর মহল্লার রাস্তা এক নয়

বাংলাদেশের অটোরিকশা সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান সম্ভবত এখানেই।

একটি স্বল্পগতির ই-রিকশা একটি আবাসিক এলাকার সরু সড়কে বা স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক রুটে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীর জন্য কার্যকর হতে পারে। কিন্তু একই যান যখন একটি জাতীয় মহাসড়কে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে চলতে থাকে, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এখানে শুধু যানজট নয়, গতির পার্থক্যই দুর্ঘটনার বড় ঝুঁকি।

একটি দ্রুতগতির বাস বা ট্রাকের সামনে হঠাৎ ধীরগতির তিন চাকার যান চলে এলে চালকের প্রতিক্রিয়ার সময় কমে যায়। ওভারটেক করার সময়ও ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে ছোট একটি যান কখনো কখনো বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ কারণে “অটোরিকশা থাকবে কি থাকবে না”—এই বিতর্কের পরিবর্তে প্রশ্ন হওয়া উচিত—

কোন অটোরিকশা, কোন রাস্তায়, কী গতিতে এবং কোন সময় চলবে?

মহাসড়কের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, তা একটি গ্রামীণ সংযোগ সড়কের জন্য একই হওয়া উচিত নয়। একইভাবে রাজধানীর ব্যস্ত প্রধান সড়ক এবং একটি উপজেলা শহরের অভ্যন্তরীণ সড়কের জন্যও একই ধরনের নীতি কার্যকর হতে পারে না।

অর্থাৎ অটোরিকশা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন রাস্তার শ্রেণি অনুযায়ী পৃথক নীতি।

যানজটের জন্য শুধু অটোরিকশাকে দায়ী করা কি ঠিক?

অটোরিকশা যানজট সৃষ্টি করে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা, ভুল পথে চলা, হঠাৎ মোড় নেওয়া এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা শহরের চলাচলকে ধীর করে।

কিন্তু আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে হবে—

ঢাকার যানজট কি শুধু অটোরিকশার কারণে?

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, বাসের অনিয়ন্ত্রিত থামা, সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতা, রাস্তার ওপর অবৈধ দোকান পাট ও নির্মাণসামগ্রী রাখা, অপর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—এসবও যানজটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তাই সব সমস্যার দায় অটোরিকশার ওপর চাপিয়ে দিলে আমরা প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়াল করার ঝুঁকিতে পড়ি।

অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে।

বিদ্যুৎ খরচ ও ব্যাটারির পরিবেশগত প্রশ্ন

ব্যাটারিচালিত যান সরাসরি ধোঁয়া ছাড়ে না—এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু “ধোঁয়া নেই” মানেই “সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব”—এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।

বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে, কী ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার হচ্ছে, ব্যাটারির আয়ু শেষ হলে তা কোথায় যাচ্ছে এবং পুরোনো ব্যাটারি কীভাবে পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদে নিষ্পত্তি হচ্ছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের নীতিতে শুধু “ই-রিকশা বৈধ কি অবৈধ”—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

কোন ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করা যাবে, কী মানের ব্যাটারি ব্যবহার করা যাবে, কতদিন পর তা পরিবর্তন করতে হবে এবং ব্যবহৃত ব্যাটারি কোথায় ও কীভাবে পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি করা হবে?

পরিবেশবান্ধব পরিবহন শুধু ধোঁয়াহীন যান তৈরি করার নাম নয়; পুরো ব্যবস্থাটিকেই পরিবেশবান্ধব করতে হয়।

অবৈধ চার্জিং: চালককে নয়, ব্যবস্থাকেও দেখতে হবে

ব্যাটারিচালিত যান চার্জ করার জন্য বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু যেখানে বৈধ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী চার্জিং অবকাঠামো নেই, সেখানে অনিয়মিত বা অবৈধ সংযোগের সুযোগ তৈরি হয়।

এখানে আবারও শুধু ব্যবহারকারীকে দোষ দিলে হবে না।

রাষ্ট্র যদি বৈধ চার্জিং স্টেশন তৈরি না করে, মানসম্মত বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা না করে এবং চার্জিংয়ের জন্য বাস্তবসম্মত ভাড়া ও ব্যবসায়িক কাঠামো না দেয়, তাহলে অনানুষ্ঠানিক বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ থেকেই যায়।

তাই প্রয়োজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং স্টেশন, মিটারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার, অগ্নিনিরাপত্তা এবং ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা।

চালককে অপরাধী নয়, প্রশিক্ষিত পেশাজীবী হিসেবে দেখতে হবে

অটোরিকশা চালানোও একটি পেশা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই পেশাটি অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক অবস্থায় রয়েছে।

ফলে চালকের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, আচরণবিধি, যাত্রী নিরাপত্তা—এসব বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

এখানে পরিবর্তন জরুরি।

প্রতিটি চালকের জন্য মৌলিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন, পথচারীর অধিকার, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয়, নারী ও শিশু যাত্রীর নিরাপত্তা এবং গাড়ির মৌলিক রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ থাকা উচিত।

একজন চালক শুধু স্টিয়ারিং ধরবেন না; তাকে জানতে হবে কখন গতি কমাতে হবে, কোথায় থামতে হবে, কীভাবে যাত্রী ওঠানো-নামানো নিরাপদ করতে হবে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন।

অর্থাৎ নিরাপদ পরিবহন তৈরি করতে হলে শুধু নিরাপদ গাড়ি নয়, নিরাপদ ও প্রশিক্ষিত চালকও তৈরি করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ভাড়া নির্ধারণ করবে কে?

অটোরিকশার আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো ভাড়ার অনিশ্চয়তা।

অনেক এলাকায় যাত্রী ও চালকের মধ্যে ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি হয়। কোথাও নির্ধারিত ভাড়া নেই, কোথাও থাকলেও তা কার্যকর হয় না। এতে একদিকে যাত্রী হয়রানির শিকার হতে পারেন, অন্যদিকে চালকেরাও জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ ও দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয় না পেলে সমস্যায় পড়েন।

তাই রুট ও দূরত্বভিত্তিক স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত ভাড়া কাঠামো থাকা দরকার।

যাত্রীর জন্য ভাড়া যেন পূর্বানুমেয় হয় এবং চালকের জন্যও যেন তা ন্যায্য হয়—এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

কারণ একটি পরিবহনব্যবস্থা তখনই টেকসই হয়, যখন চালকও বাঁচতে পারেন এবং যাত্রীও প্রতারিত বোধ করেন না।

সমাধান কী?

অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। আবার “যে যার মতো চলবে”—এমন ব্যবস্থাও চলতে পারে না।

সমাধান হতে পারে কয়েকটি সমন্বিত পদক্ষেপে।

প্রথমত, নিবন্ধন।
প্রতিটি বৈধ অটোরিকশার একটি নির্দিষ্ট পরিচয়, নম্বর ও নিবন্ধন থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ।
লাইসেন্স ছাড়া যাত্রী পরিবহন বন্ধ করতে হবে এবং চালকদের জন্য মৌলিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তৃতীয়ত, রুট নির্ধারণ।
মহাসড়ক, জাতীয় সড়ক, প্রধান নগর সড়ক এবং আবাসিক বা স্থানীয় সড়কের জন্য আলাদা নীতি থাকতে হবে।

চতুর্থত, যানবাহনের মান নির্ধারণ।
ব্রেক, চেসিস, চাকা, আলো, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সংযোগসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নিরাপত্তা মান থাকতে হবে।

পঞ্চমত, বৈধ চার্জিং অবকাঠামো।
চার্জিং স্টেশনকে পরিবহন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

ষষ্ঠত, স্বচ্ছ ভাড়া কাঠামো।
রুট, দূরত্ব ও সেবার ধরন অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে তা দৃশ্যমানভাবে জানাতে হবে।

সপ্তমত, নির্ধারিত স্টপেজ ও শৃঙ্খলা।
যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ডিজিটাল রুট পারমিট, নির্দিষ্ট গতিসীমা এবং নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থা।

নিষেধাজ্ঞা নয়, শৃঙ্খলাই হতে পারে সমাধান

বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—যে পরিবহনব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, সেটিকে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া কঠিন।

বরং রাষ্ট্রের কাজ হলো অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।

অটোরিকশাকে রাস্তা থেকে একদিনে উধাও করে দেওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজনও হয়তো নেই। প্রয়োজন হলো—যে অটোরিকশা নিরাপদ, সেটি চলবে; যে চালক প্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সধারী, সে চালাবে; যে রাস্তা উপযুক্ত, সেখানেই যানটি চলবে; যে চার্জিং ব্যবস্থা বৈধ, সেখান থেকেই বিদ্যুৎ নেবে।

অর্থাৎ আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অটোরিকশাকে নির্মূল করা নয়, অরাজকতাকে নির্মূল করা।

এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অটোরিকশা নিজে কোনো অপরাধী নয়। অপরাধ হলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ যান চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, অবৈধভাবে রাস্তা দখল করা এবং নিরাপত্তার ন্যূনতম মান না মেনে যাত্রী পরিবহন করা।

শেষ কথা

অটোরিকশাকে আমরা দুইভাবে দেখতে পারি।

একদিকে এটি যানজট, দুর্ঘটনা, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার প্রতীক। অন্যদিকে এটি একজন শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজি, একজন রোগীর হাসপাতালে যাওয়ার পথ, একজন শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর বাহন এবং একটি গ্রামের বাজারের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।

তাই অটোরিকশার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে—আমরা শুধু একটি যানবাহন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না; আমরা মানুষের চলাচল, জীবিকা, সময়, অর্থ এবং নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।

যে মানুষ সকালে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা অর্জন করেন এবং যে মানুষ সন্ধ্যায় সেই অটোরিকশায় চড়ে বাড়ি ফেরেন—দুজনকেই এই নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে।

অটোরিকশা বন্ধ করা সহজ স্লোগান হতে পারে; কিন্তু অটোরিকশাকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও জনবান্ধব পরিবহনব্যবস্থায় পরিণত করাই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত দক্ষতার পরীক্ষা।

কারণ সমস্যাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া আর সমস্যার সমাধান করা—দুটো এক কথা নয়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন অটোরিকশাবিরোধী নীতি নয়, অটোরিকশাকে শৃঙ্খলায় আনার নীতি।

আর সেই শৃঙ্খলার কেন্দ্রে থাকতে হবে একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি—

মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, মানুষের জীবিকা রক্ষা পাবে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে; কিন্তু মানুষের জীবন কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে পড়বে না।

লেখক: কবি সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

আশুলিয়ায় ‘মমতা স্বেচ্ছায় রক্তদান ফাউন্ডেশন’-এর শুভ উদ্বোধন

অটোরিকশা: জনজীবনের আশীর্বাদ, নাকি সড়কের অভিশাপ?

Update Time : 09:12:24 pm, Thursday, 27 August 2026
109

বাংলাদেশের কোনো শহর, উপজেলা কিংবা গ্রামাঞ্চলের ব্যস্ত সড়কে দাঁড়ালে একটি দৃশ্য খুব সহজেই চোখে পড়ে—অটোরিকশার সারি। কোথাও সিএনজিচালিত অটোরিকশা, কোথাও ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা বা ইজিবাইক, কোথাও আবার স্থানীয়ভাবে তৈরি নানা ধরনের তিন চাকার যান। শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তা—সর্বত্রই এদের উপস্থিতি।

কেউ অটোরিকশাকে দেখেন যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে, কেউ দেখেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার অপরিহার্য বাহন হিসেবে। বাস্তবতা হলো, দুটো কথাই সত্য।

অটোরিকশা বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার একটি সমস্যা—কিন্তু একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু, “অটোরিকশা বন্ধ করা হবে কি না?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহনব্যবস্থার অংশে পরিণত করা যায়?

যে বাহনটি দরিদ্র মানুষের কাছে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন

বাংলাদেশের গণপরিবহনব্যবস্থা এখনো এমন নয় যে প্রতিটি মানুষ তার বাড়ির কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য বাস, ট্রেন বা অন্য কোনো গণপরিবহন পেয়ে যাবে। বিশেষ করে গ্রাম, উপজেলা, মফস্বল শহর এবং বড় শহরের গলি-মহল্লায় অটোরিকশা অনেক সময় শেষ মাইলের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

একজন কৃষক গ্রামের বাড়ি থেকে বাজারে যাচ্ছেন, একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, একজন রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, একজন শ্রমিক কর্মস্থলে যাচ্ছেন—তাদের অনেকের জন্য অটোরিকশা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বাস্তব প্রয়োজন।

ঢাকার মতো যানজটপূর্ণ শহরেও স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে রিকশা ও অটোরিকশার গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। কারণ বড় গণপরিবহনের রুট যেখানে শেষ হয়, অনেক সময় সেখান থেকেই অটোরিকশার যাত্রা শুরু হয়। এটি মানুষের বাড়ি, বাজার, কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রের সঙ্গে প্রধান সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে।

আর এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।

মুখে আমরা অনেকেই অটোরিকশার সমালোচনা করি, যানজটের জন্য তাকে দায়ী করি, চালকের আচরণ নিয়ে অভিযোগ করি; কিন্তু নিজের যাতায়াতের প্রয়োজনে সেই অটোরিকশাতেই উঠে বসি। কেন?

কারণ বাস্তব জীবনে মানুষকে শুধু আদর্শ পরিবহনব্যবস্থা দিয়ে চলতে হয় না; তাকে সময়, দূরত্ব ও খরচের হিসাবও করতে হয়। প্যাডেল রিকশার তুলনায় অটোরিকশা অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত, চালকের কায়িক শ্রম তুলনামূলক কম এবং স্বল্প দূরত্বে এর ভাড়াও অনেক মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।

অর্থাৎ অটোরিকশার চালিকাশক্তি শুধু চালক নন—যাত্রীদের চাহিদাও এর বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ।

মানুষ যদি এ বাহন ব্যবহার না করত, তাহলে দেশের শহর-গ্রামজুড়ে এত বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার বিস্তার ঘটত না।

তাই অটোরিকশাকে শুধু “রাস্তার যান” হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো।

অটোরিকশা শুধু যাত্রী বহন করে না, জীবিকাও বহন করে

একটি অটোরিকশার স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসে থাকা মানুষটির দিকে আমরা অনেক সময় তাকাই না। কিন্তু তার পেছনে একটি পরিবার থাকে।

একজন চালকের আয় দিয়ে সংসার চলে, সন্তানের পড়াশোনা হয়, বাড়িভাড়া দেওয়া হয়, বাজার হয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে গ্যারেজ মালিক, মেকানিক, যন্ত্রাংশ বিক্রেতা, ব্যাটারি ব্যবসায়ী, চার্জিং স্টেশনের কর্মী, গাড়ি তৈরির কারিগর এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিস্তার পরিবহন খাতে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। অনেক মানুষের কাছে এটি আনুষ্ঠানিক চাকরির বিকল্প হিসেবে জীবিকার পথ খুলে দিয়েছে।

সুতরাং অটোরিকশা নিয়ে নীতি নির্ধারণের সময় শুধু যানবাহনের সংখ্যা গুনলে হবে না; মানুষের জীবিকার হিসাবও করতে হবে।

একটি অটোরিকশা বন্ধ করা মানে শুধু একটি যান রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। এর অর্থ হতে পারে একটি পরিবারের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়া।

তাই নিয়ন্ত্রণ চাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নামে হঠাৎ জীবিকা ধ্বংস করা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।

কিন্তু এখানেই আসে বড় প্রশ্ন—নিরাপত্তার দায় নেবে কে?

অটোরিকশার ইতিবাচক দিক যতই থাকুক, এর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে তৈরি ও পরিচালিত হয়েছে। সব যান একই মানের নয়, সব চালকের প্রশিক্ষণও একই নয়। কোথাও পুরোনো রিকশার কাঠামোর সঙ্গে মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করে তুলনামূলক বেশি গতির যান তৈরি করা হয়েছে।

সমস্যাটি এখানেই।

যে কাঠামো একটি ধীরগতির প্যাডেল রিকশার জন্য তৈরি, সেটিতে মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করে গতি বাড়ালেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না। যানটির ব্রেক, চাকা, চেসিস, স্টিয়ারিং, আলো, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং ব্যাটারি স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মান থাকা জরুরি।

স্বল্পগতির স্থানীয় যাতায়াতের জন্য উপযোগী এসব যানকে মহাসড়ক বা দ্রুতগতির সড়কে চালানোও ঝুঁকিপূর্ণ।

তাই এখানে শুধু চালককে দোষ দিলে সমস্যার মূল কারণ ধরা পড়বে না।

নিরাপদ যান তৈরি না করে, চালককে প্রশিক্ষণ না দিয়ে, নিবন্ধন না করে এবং সঠিক রাস্তা নির্ধারণ না করে শুধু চালককে শাস্তি দেওয়া সমস্যার অর্ধেক সমাধান মাত্র।

মহাসড়ক আর মহল্লার রাস্তা এক নয়

বাংলাদেশের অটোরিকশা সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান সম্ভবত এখানেই।

একটি স্বল্পগতির ই-রিকশা একটি আবাসিক এলাকার সরু সড়কে বা স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক রুটে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীর জন্য কার্যকর হতে পারে। কিন্তু একই যান যখন একটি জাতীয় মহাসড়কে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে চলতে থাকে, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এখানে শুধু যানজট নয়, গতির পার্থক্যই দুর্ঘটনার বড় ঝুঁকি।

একটি দ্রুতগতির বাস বা ট্রাকের সামনে হঠাৎ ধীরগতির তিন চাকার যান চলে এলে চালকের প্রতিক্রিয়ার সময় কমে যায়। ওভারটেক করার সময়ও ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে ছোট একটি যান কখনো কখনো বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ কারণে “অটোরিকশা থাকবে কি থাকবে না”—এই বিতর্কের পরিবর্তে প্রশ্ন হওয়া উচিত—

কোন অটোরিকশা, কোন রাস্তায়, কী গতিতে এবং কোন সময় চলবে?

মহাসড়কের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, তা একটি গ্রামীণ সংযোগ সড়কের জন্য একই হওয়া উচিত নয়। একইভাবে রাজধানীর ব্যস্ত প্রধান সড়ক এবং একটি উপজেলা শহরের অভ্যন্তরীণ সড়কের জন্যও একই ধরনের নীতি কার্যকর হতে পারে না।

অর্থাৎ অটোরিকশা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন রাস্তার শ্রেণি অনুযায়ী পৃথক নীতি।

যানজটের জন্য শুধু অটোরিকশাকে দায়ী করা কি ঠিক?

অটোরিকশা যানজট সৃষ্টি করে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা, ভুল পথে চলা, হঠাৎ মোড় নেওয়া এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা শহরের চলাচলকে ধীর করে।

কিন্তু আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে হবে—

ঢাকার যানজট কি শুধু অটোরিকশার কারণে?

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, বাসের অনিয়ন্ত্রিত থামা, সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতা, রাস্তার ওপর অবৈধ দোকান পাট ও নির্মাণসামগ্রী রাখা, অপর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—এসবও যানজটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তাই সব সমস্যার দায় অটোরিকশার ওপর চাপিয়ে দিলে আমরা প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়াল করার ঝুঁকিতে পড়ি।

অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে।

বিদ্যুৎ খরচ ও ব্যাটারির পরিবেশগত প্রশ্ন

ব্যাটারিচালিত যান সরাসরি ধোঁয়া ছাড়ে না—এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু “ধোঁয়া নেই” মানেই “সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব”—এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।

বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে, কী ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার হচ্ছে, ব্যাটারির আয়ু শেষ হলে তা কোথায় যাচ্ছে এবং পুরোনো ব্যাটারি কীভাবে পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদে নিষ্পত্তি হচ্ছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের নীতিতে শুধু “ই-রিকশা বৈধ কি অবৈধ”—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

কোন ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করা যাবে, কী মানের ব্যাটারি ব্যবহার করা যাবে, কতদিন পর তা পরিবর্তন করতে হবে এবং ব্যবহৃত ব্যাটারি কোথায় ও কীভাবে পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি করা হবে?

পরিবেশবান্ধব পরিবহন শুধু ধোঁয়াহীন যান তৈরি করার নাম নয়; পুরো ব্যবস্থাটিকেই পরিবেশবান্ধব করতে হয়।

অবৈধ চার্জিং: চালককে নয়, ব্যবস্থাকেও দেখতে হবে

ব্যাটারিচালিত যান চার্জ করার জন্য বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু যেখানে বৈধ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী চার্জিং অবকাঠামো নেই, সেখানে অনিয়মিত বা অবৈধ সংযোগের সুযোগ তৈরি হয়।

এখানে আবারও শুধু ব্যবহারকারীকে দোষ দিলে হবে না।

রাষ্ট্র যদি বৈধ চার্জিং স্টেশন তৈরি না করে, মানসম্মত বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা না করে এবং চার্জিংয়ের জন্য বাস্তবসম্মত ভাড়া ও ব্যবসায়িক কাঠামো না দেয়, তাহলে অনানুষ্ঠানিক বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ থেকেই যায়।

তাই প্রয়োজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং স্টেশন, মিটারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার, অগ্নিনিরাপত্তা এবং ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা।

চালককে অপরাধী নয়, প্রশিক্ষিত পেশাজীবী হিসেবে দেখতে হবে

অটোরিকশা চালানোও একটি পেশা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই পেশাটি অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক অবস্থায় রয়েছে।

ফলে চালকের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, আচরণবিধি, যাত্রী নিরাপত্তা—এসব বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

এখানে পরিবর্তন জরুরি।

প্রতিটি চালকের জন্য মৌলিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন, পথচারীর অধিকার, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয়, নারী ও শিশু যাত্রীর নিরাপত্তা এবং গাড়ির মৌলিক রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ থাকা উচিত।

একজন চালক শুধু স্টিয়ারিং ধরবেন না; তাকে জানতে হবে কখন গতি কমাতে হবে, কোথায় থামতে হবে, কীভাবে যাত্রী ওঠানো-নামানো নিরাপদ করতে হবে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন।

অর্থাৎ নিরাপদ পরিবহন তৈরি করতে হলে শুধু নিরাপদ গাড়ি নয়, নিরাপদ ও প্রশিক্ষিত চালকও তৈরি করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ভাড়া নির্ধারণ করবে কে?

অটোরিকশার আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো ভাড়ার অনিশ্চয়তা।

অনেক এলাকায় যাত্রী ও চালকের মধ্যে ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি হয়। কোথাও নির্ধারিত ভাড়া নেই, কোথাও থাকলেও তা কার্যকর হয় না। এতে একদিকে যাত্রী হয়রানির শিকার হতে পারেন, অন্যদিকে চালকেরাও জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ ও দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয় না পেলে সমস্যায় পড়েন।

তাই রুট ও দূরত্বভিত্তিক স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত ভাড়া কাঠামো থাকা দরকার।

যাত্রীর জন্য ভাড়া যেন পূর্বানুমেয় হয় এবং চালকের জন্যও যেন তা ন্যায্য হয়—এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

কারণ একটি পরিবহনব্যবস্থা তখনই টেকসই হয়, যখন চালকও বাঁচতে পারেন এবং যাত্রীও প্রতারিত বোধ করেন না।

সমাধান কী?

অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। আবার “যে যার মতো চলবে”—এমন ব্যবস্থাও চলতে পারে না।

সমাধান হতে পারে কয়েকটি সমন্বিত পদক্ষেপে।

প্রথমত, নিবন্ধন।
প্রতিটি বৈধ অটোরিকশার একটি নির্দিষ্ট পরিচয়, নম্বর ও নিবন্ধন থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ।
লাইসেন্স ছাড়া যাত্রী পরিবহন বন্ধ করতে হবে এবং চালকদের জন্য মৌলিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তৃতীয়ত, রুট নির্ধারণ।
মহাসড়ক, জাতীয় সড়ক, প্রধান নগর সড়ক এবং আবাসিক বা স্থানীয় সড়কের জন্য আলাদা নীতি থাকতে হবে।

চতুর্থত, যানবাহনের মান নির্ধারণ।
ব্রেক, চেসিস, চাকা, আলো, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সংযোগসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নিরাপত্তা মান থাকতে হবে।

পঞ্চমত, বৈধ চার্জিং অবকাঠামো।
চার্জিং স্টেশনকে পরিবহন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

ষষ্ঠত, স্বচ্ছ ভাড়া কাঠামো।
রুট, দূরত্ব ও সেবার ধরন অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে তা দৃশ্যমানভাবে জানাতে হবে।

সপ্তমত, নির্ধারিত স্টপেজ ও শৃঙ্খলা।
যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ডিজিটাল রুট পারমিট, নির্দিষ্ট গতিসীমা এবং নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থা।

নিষেধাজ্ঞা নয়, শৃঙ্খলাই হতে পারে সমাধান

বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—যে পরিবহনব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, সেটিকে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া কঠিন।

বরং রাষ্ট্রের কাজ হলো অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।

অটোরিকশাকে রাস্তা থেকে একদিনে উধাও করে দেওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজনও হয়তো নেই। প্রয়োজন হলো—যে অটোরিকশা নিরাপদ, সেটি চলবে; যে চালক প্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সধারী, সে চালাবে; যে রাস্তা উপযুক্ত, সেখানেই যানটি চলবে; যে চার্জিং ব্যবস্থা বৈধ, সেখান থেকেই বিদ্যুৎ নেবে।

অর্থাৎ আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অটোরিকশাকে নির্মূল করা নয়, অরাজকতাকে নির্মূল করা।

এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অটোরিকশা নিজে কোনো অপরাধী নয়। অপরাধ হলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ যান চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, অবৈধভাবে রাস্তা দখল করা এবং নিরাপত্তার ন্যূনতম মান না মেনে যাত্রী পরিবহন করা।

শেষ কথা

অটোরিকশাকে আমরা দুইভাবে দেখতে পারি।

একদিকে এটি যানজট, দুর্ঘটনা, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার প্রতীক। অন্যদিকে এটি একজন শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজি, একজন রোগীর হাসপাতালে যাওয়ার পথ, একজন শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর বাহন এবং একটি গ্রামের বাজারের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।

তাই অটোরিকশার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে—আমরা শুধু একটি যানবাহন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না; আমরা মানুষের চলাচল, জীবিকা, সময়, অর্থ এবং নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।

যে মানুষ সকালে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা অর্জন করেন এবং যে মানুষ সন্ধ্যায় সেই অটোরিকশায় চড়ে বাড়ি ফেরেন—দুজনকেই এই নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে।

অটোরিকশা বন্ধ করা সহজ স্লোগান হতে পারে; কিন্তু অটোরিকশাকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও জনবান্ধব পরিবহনব্যবস্থায় পরিণত করাই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত দক্ষতার পরীক্ষা।

কারণ সমস্যাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া আর সমস্যার সমাধান করা—দুটো এক কথা নয়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন অটোরিকশাবিরোধী নীতি নয়, অটোরিকশাকে শৃঙ্খলায় আনার নীতি।

আর সেই শৃঙ্খলার কেন্দ্রে থাকতে হবে একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি—

মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, মানুষের জীবিকা রক্ষা পাবে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে; কিন্তু মানুষের জীবন কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে পড়বে না।

লেখক: কবি সাহিত্যিক ও কলামিস্ট