11:04 am, Monday, 24 August 2026

ভাণ্ডারিয়ায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ- ইউএনওর তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে তদন্ত কমিটি গঠন

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষকদের হয়রানি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নারী শিক্ষককে কটূক্তিসহ বিভিন্ন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার দাবি করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাসিবুল হাসান। অভিযোগগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে একাধিক সহকারী শিক্ষকের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্ত করেন ইউএনও মো. হাসিবুল হাসান। এ সময় তিনি অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে মনগড়া রেজোলিউশন তৈরি, ভাউচারে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া, আর্থিক অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ভাউচারে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, শোকজের হুমকি এবং অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

নারী শিক্ষক সেলিনা আক্তার অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক প্রকাশ্যে তার পোশাক নিয়ে কটূক্তি করেছেন এবং তাকে বিভিন্নভাবে মানসিক হয়রানি করেছেন। তার অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ রাখার অভিযোগও করেন তিনি।

শিক্ষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রশিদ ও যথাযথ ভাউচার ছাড়াই বিদ্যালয়ের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ওই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তার যথাযথ হিসাবও উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এ ছাড়া শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ হাওলাদার ও সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের কাছ থেকে হুমকি-ধামকি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হামিদা বেগমকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রায় পাঁচ মাস বিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা এবং ওই সময় বেতন-ভাতা বন্ধ রাখার অভিযোগও করেছেন শিক্ষকরা।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো. শাহ আলমের স্বাক্ষর জাল করে সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। সাময়িক বরখাস্ত ও পুনর্বহালের সুযোগ দেখিয়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে ফারজানা আক্তার নিপা নামে একজনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্যারা-টিচার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট ও কোচিং পড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। ওই কোচিং কার্যক্রম থেকে প্রধান শিক্ষক কমিশন নিতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের টিউশন ফি ও বিভিন্ন তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, বিদ্যালয়ে জমা হওয়া বিভিন্ন অর্থ প্রধান শিক্ষক নিজের বাসায় নিয়ে যেতেন এবং পরে নিজের সুবিধামতো ভাউচার তৈরি করে শিক্ষকদের দিয়ে স্বাক্ষর করাতেন।

বিদ্যালয়ের অর্থ যৌথ ব্যাংক হিসাবে না রেখে প্রধান শিক্ষক নিজের একক নামে অ্যাকাউন্টে জমা ও উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অর্থের ব্যয়ের হিসাব শিক্ষক ও অভিভাবকদের জানানো হয়নি বলে দাবি অভিযোগকারীদের।

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। টেস্ট পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া এবং টিসি বা ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।

এ ছাড়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কোচিং করানোর নামে অর্থ আদায় এবং কোচিংয়ে যুক্ত সহকারী শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগও করেছেন তারা।

২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি লিয়াকত আলী তালুকদারের করা একটি মামলায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ওই তদন্তে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যতা অধিকতর যাচাইয়ের বিষয় রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমান বলেন, অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা প্রশাসনিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তিনি তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও নথিপত্র উপস্থাপনের কথা জানান।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান বলেন, শিক্ষকদের লিখিত অভিযোগ এবং সরেজমিন তদন্তে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি অভিযোগগুলো বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনে জনসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর

ভাণ্ডারিয়ায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ- ইউএনওর তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে তদন্ত কমিটি গঠন

Update Time : 05:41:18 pm, Monday, 17 August 2026

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষকদের হয়রানি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নারী শিক্ষককে কটূক্তিসহ বিভিন্ন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার দাবি করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাসিবুল হাসান। অভিযোগগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে একাধিক সহকারী শিক্ষকের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্ত করেন ইউএনও মো. হাসিবুল হাসান। এ সময় তিনি অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে মনগড়া রেজোলিউশন তৈরি, ভাউচারে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া, আর্থিক অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ভাউচারে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, শোকজের হুমকি এবং অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

নারী শিক্ষক সেলিনা আক্তার অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক প্রকাশ্যে তার পোশাক নিয়ে কটূক্তি করেছেন এবং তাকে বিভিন্নভাবে মানসিক হয়রানি করেছেন। তার অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ রাখার অভিযোগও করেন তিনি।

শিক্ষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রশিদ ও যথাযথ ভাউচার ছাড়াই বিদ্যালয়ের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ওই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তার যথাযথ হিসাবও উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এ ছাড়া শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ হাওলাদার ও সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের কাছ থেকে হুমকি-ধামকি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হামিদা বেগমকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রায় পাঁচ মাস বিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা এবং ওই সময় বেতন-ভাতা বন্ধ রাখার অভিযোগও করেছেন শিক্ষকরা।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো. শাহ আলমের স্বাক্ষর জাল করে সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। সাময়িক বরখাস্ত ও পুনর্বহালের সুযোগ দেখিয়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে ফারজানা আক্তার নিপা নামে একজনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্যারা-টিচার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট ও কোচিং পড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। ওই কোচিং কার্যক্রম থেকে প্রধান শিক্ষক কমিশন নিতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের টিউশন ফি ও বিভিন্ন তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, বিদ্যালয়ে জমা হওয়া বিভিন্ন অর্থ প্রধান শিক্ষক নিজের বাসায় নিয়ে যেতেন এবং পরে নিজের সুবিধামতো ভাউচার তৈরি করে শিক্ষকদের দিয়ে স্বাক্ষর করাতেন।

বিদ্যালয়ের অর্থ যৌথ ব্যাংক হিসাবে না রেখে প্রধান শিক্ষক নিজের একক নামে অ্যাকাউন্টে জমা ও উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অর্থের ব্যয়ের হিসাব শিক্ষক ও অভিভাবকদের জানানো হয়নি বলে দাবি অভিযোগকারীদের।

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। টেস্ট পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া এবং টিসি বা ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।

এ ছাড়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কোচিং করানোর নামে অর্থ আদায় এবং কোচিংয়ে যুক্ত সহকারী শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগও করেছেন তারা।

২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি লিয়াকত আলী তালুকদারের করা একটি মামলায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ওই তদন্তে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যতা অধিকতর যাচাইয়ের বিষয় রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমান বলেন, অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা প্রশাসনিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তিনি তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও নথিপত্র উপস্থাপনের কথা জানান।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান বলেন, শিক্ষকদের লিখিত অভিযোগ এবং সরেজমিন তদন্তে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি অভিযোগগুলো বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।