1:35 pm, Saturday, 12 September 2026

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম নৃত্য ও সংস্কৃতি : রুহুল কবির রিজভী

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, নৃত্য ও সংগীতের সংমিশ্রণে যে সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটে, তা মানুষের রক্তে ক্ষোভ ও উদ্দীপনার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এটি এতই শক্তিশালী একটি মাধ্যম যে জোর করে রাজসিংহাসন দখল করে থাকা ভয়ংকর ফ্যাসিস্টদের আসনও নাড়িয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, সংস্কৃতির আবহমান ধারার অন্ধকার ও অমানবিক দিকগুলোকে দূরীভূত করে সত্য, সুন্দর, নারী ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির চর্চাকে ধারণ করাই আধুনিক সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা’র নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রুহুল কবির রিজভী তার বক্তব্যে সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘সব পরিবারে সংস্কৃতির মেলবন্ধন থাকে না। একমাত্র কিছু খানদানি পরিবারেই এই চর্চা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যাদের পিতা নজরুল ললিতকলা একাডেমি গড়ে তুলেছেন এবং যার মা এ দেশের নৃত্যশিল্পের একজন গুরুস্থানীয় ‘গুরু মা’ হিসেবে পরিচিত, তাদের অবদান অনস্বীকার্য। আমি সেই শ্রদ্ধেয় মাতাকে অত্যন্ত সম্মান জানাচ্ছি।’

রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি, নৃত্য সম্পর্কে আমার গভীর কোনো টেকনিক্যাল জ্ঞান নেই। তবে যেকোনো নৃত্য যখন গান ও বাদ্যের তালে তালে মঞ্চস্থ হয়, তখন তা সত্যি মনকে নির্মল করে তোলে। কাজের বা মনের যতই চাপ থাকুক না কেন, তা মুহূর্তেই দূরে ঠেলে দেয়। আমার কাছে মনে হয়েছে—গীত এবং বাদ্যের ছন্দে শরীরের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে ভাব, অনুভূতি ও চিত্রকল্প গড়ে ওঠে, সেটারই ললিতকলা হলো নৃত্য।’

তিনি আরও বলেন, যুগ যুগ ধরে নানাভাবেই বিশ্বজুড়ে এবং আমাদের দেশে নৃত্যশিল্প গড়ে উঠেছে। শাস্ত্রীয় নৃত্য, লোকনৃত্য, আধুনিক নৃত্য—এমন বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে। আমাদের লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই লেটো দল, কবিগান কিংবা গম্ভীরার মতো অনুষ্ঠানগুলো চলে আসছে। কবিগানে যেমন দুই পক্ষের গানের প্রতিযোগিতা ও অঙ্গভঙ্গি থাকে, তেমনি উত্তরাঞ্চলের ‘গম্ভীরা’ একটি বড় মাপের নৃত্যকলা। এসব লোকজ ঐতিহ্যের গান ও নাচ আমাদের সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘নৃত্য এমন একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মাধ্যম যা ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারে। এক সময় আন্দোলনের মঞ্চে যখন গান ও নাচের মাধ্যমে প্রতিবাদ রূপ পেত, তা মানুষের রক্তের মধ্যে দারুণ উদ্দীপনা সঞ্চার করত। বিশেষ করে ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ যখন নাচের তালে তালে গীত হয়, তখন মানুষের রক্তে আগুন ধরে যায়। তখন সামনে পুলিশের ব্যারিকেড থাকুক কিংবা র‌্যাবের ব্যারিকেড থাকুক—সব বাধা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবল প্রবণতা ও প্রেরণা তৈরি হয়। বিগত ফ্যাসিবাদের আমলেও ‘দেশটা কি তোর বাপের নাকি’ গানের সঙ্গে শিল্পীদের অঙ্গভঙ্গি গণআন্দোলনের স্রোতকে আরও শক্তিশালী ও বেগবান করেছিল।’

আবহমান সংস্কৃতির অন্ধকার দিক বর্জনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকজ ও আবহমান সংস্কৃতির মধ্যে কিছু অন্ধকারের দিকও ছিল। ঐতিহ্যকে ভুলে গেলে চলবে না, তবে সেই অন্ধকারগুলোকে সরিয়ে প্রগতির পথে এগোতে হবে। আমাদের ঐতিহ্যে একসময় সতীদাহ প্রথা ছিল, যা একটি অত্যন্ত অমানবিক বিষয়। পরবর্তীতে বিধবা বিবাহ প্রচলন হয়েছে। সতীদাহ প্রথাকে উৎসাহিত করতেও একসময় গান বা চর্চা ছিল। কিন্তু লোকজ ঐতিহ্য থেকে সেই অমানবিক প্রথা বিলোপ করে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীকে শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত করার জন্য যে গান ও আধুনিক নৃত্যের সূচনা হয়, সেটাই প্রগতির প্রতীক। অতীতের অমানবিক ও অন্ধকার দিক বাদ দিয়ে অগ্রগতির জন্য যে নৃত্য ও গান রচিত হবে, সেটাই আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, ‘আজকে আর পূর্বের নষ্ট সংস্কৃতির অংশ হলে আমাদের চলবে না। এখন আর গুম, গুপ্তহত্যা কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যুগ নেই। বিরোধী দল এখন লংমার্চ বা বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলছে। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কর্মসূচি থাকবে, তারা পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে কথা বলবে এবং সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা করবে—এতে কোনো বাধা বা আপত্তি নেই। কিন্তু অতীতের কুৎসিত সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করলে দেশ আবার অন্ধকারের দিকে যাবে।’

জ্বালানি সংকট ও বিরোধী দলের ভূমিকার বিষয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণ সরকারের কোনো অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা নয়। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার বৈশ্বিক যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিকভাবে এই সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

শিল্প ও সংস্কৃতির অব্যাহত চর্চার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, যা সত্য ও সুন্দর—তার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংগীত, সাহিত্য ও নৃত্যের নিয়মিত চর্চা মানুষের মন থেকে নিষ্ঠুরতা ও রক্তপিপাসু মানসিকতা দূর করে এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

আশুলিয়ায় ‘মমতা স্বেচ্ছায় রক্তদান ফাউন্ডেশন’-এর শুভ উদ্বোধন

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম নৃত্য ও সংস্কৃতি : রুহুল কবির রিজভী

Update Time : 07:01:29 am, Saturday, 5 September 2026

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, নৃত্য ও সংগীতের সংমিশ্রণে যে সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটে, তা মানুষের রক্তে ক্ষোভ ও উদ্দীপনার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এটি এতই শক্তিশালী একটি মাধ্যম যে জোর করে রাজসিংহাসন দখল করে থাকা ভয়ংকর ফ্যাসিস্টদের আসনও নাড়িয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, সংস্কৃতির আবহমান ধারার অন্ধকার ও অমানবিক দিকগুলোকে দূরীভূত করে সত্য, সুন্দর, নারী ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির চর্চাকে ধারণ করাই আধুনিক সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা’র নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রুহুল কবির রিজভী তার বক্তব্যে সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘সব পরিবারে সংস্কৃতির মেলবন্ধন থাকে না। একমাত্র কিছু খানদানি পরিবারেই এই চর্চা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যাদের পিতা নজরুল ললিতকলা একাডেমি গড়ে তুলেছেন এবং যার মা এ দেশের নৃত্যশিল্পের একজন গুরুস্থানীয় ‘গুরু মা’ হিসেবে পরিচিত, তাদের অবদান অনস্বীকার্য। আমি সেই শ্রদ্ধেয় মাতাকে অত্যন্ত সম্মান জানাচ্ছি।’

রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি, নৃত্য সম্পর্কে আমার গভীর কোনো টেকনিক্যাল জ্ঞান নেই। তবে যেকোনো নৃত্য যখন গান ও বাদ্যের তালে তালে মঞ্চস্থ হয়, তখন তা সত্যি মনকে নির্মল করে তোলে। কাজের বা মনের যতই চাপ থাকুক না কেন, তা মুহূর্তেই দূরে ঠেলে দেয়। আমার কাছে মনে হয়েছে—গীত এবং বাদ্যের ছন্দে শরীরের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে ভাব, অনুভূতি ও চিত্রকল্প গড়ে ওঠে, সেটারই ললিতকলা হলো নৃত্য।’

তিনি আরও বলেন, যুগ যুগ ধরে নানাভাবেই বিশ্বজুড়ে এবং আমাদের দেশে নৃত্যশিল্প গড়ে উঠেছে। শাস্ত্রীয় নৃত্য, লোকনৃত্য, আধুনিক নৃত্য—এমন বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে। আমাদের লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই লেটো দল, কবিগান কিংবা গম্ভীরার মতো অনুষ্ঠানগুলো চলে আসছে। কবিগানে যেমন দুই পক্ষের গানের প্রতিযোগিতা ও অঙ্গভঙ্গি থাকে, তেমনি উত্তরাঞ্চলের ‘গম্ভীরা’ একটি বড় মাপের নৃত্যকলা। এসব লোকজ ঐতিহ্যের গান ও নাচ আমাদের সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘নৃত্য এমন একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মাধ্যম যা ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারে। এক সময় আন্দোলনের মঞ্চে যখন গান ও নাচের মাধ্যমে প্রতিবাদ রূপ পেত, তা মানুষের রক্তের মধ্যে দারুণ উদ্দীপনা সঞ্চার করত। বিশেষ করে ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ যখন নাচের তালে তালে গীত হয়, তখন মানুষের রক্তে আগুন ধরে যায়। তখন সামনে পুলিশের ব্যারিকেড থাকুক কিংবা র‌্যাবের ব্যারিকেড থাকুক—সব বাধা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবল প্রবণতা ও প্রেরণা তৈরি হয়। বিগত ফ্যাসিবাদের আমলেও ‘দেশটা কি তোর বাপের নাকি’ গানের সঙ্গে শিল্পীদের অঙ্গভঙ্গি গণআন্দোলনের স্রোতকে আরও শক্তিশালী ও বেগবান করেছিল।’

আবহমান সংস্কৃতির অন্ধকার দিক বর্জনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকজ ও আবহমান সংস্কৃতির মধ্যে কিছু অন্ধকারের দিকও ছিল। ঐতিহ্যকে ভুলে গেলে চলবে না, তবে সেই অন্ধকারগুলোকে সরিয়ে প্রগতির পথে এগোতে হবে। আমাদের ঐতিহ্যে একসময় সতীদাহ প্রথা ছিল, যা একটি অত্যন্ত অমানবিক বিষয়। পরবর্তীতে বিধবা বিবাহ প্রচলন হয়েছে। সতীদাহ প্রথাকে উৎসাহিত করতেও একসময় গান বা চর্চা ছিল। কিন্তু লোকজ ঐতিহ্য থেকে সেই অমানবিক প্রথা বিলোপ করে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীকে শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত করার জন্য যে গান ও আধুনিক নৃত্যের সূচনা হয়, সেটাই প্রগতির প্রতীক। অতীতের অমানবিক ও অন্ধকার দিক বাদ দিয়ে অগ্রগতির জন্য যে নৃত্য ও গান রচিত হবে, সেটাই আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, ‘আজকে আর পূর্বের নষ্ট সংস্কৃতির অংশ হলে আমাদের চলবে না। এখন আর গুম, গুপ্তহত্যা কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যুগ নেই। বিরোধী দল এখন লংমার্চ বা বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলছে। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কর্মসূচি থাকবে, তারা পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে কথা বলবে এবং সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা করবে—এতে কোনো বাধা বা আপত্তি নেই। কিন্তু অতীতের কুৎসিত সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করলে দেশ আবার অন্ধকারের দিকে যাবে।’

জ্বালানি সংকট ও বিরোধী দলের ভূমিকার বিষয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণ সরকারের কোনো অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা নয়। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার বৈশ্বিক যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিকভাবে এই সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

শিল্প ও সংস্কৃতির অব্যাহত চর্চার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, যা সত্য ও সুন্দর—তার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংগীত, সাহিত্য ও নৃত্যের নিয়মিত চর্চা মানুষের মন থেকে নিষ্ঠুরতা ও রক্তপিপাসু মানসিকতা দূর করে এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে।