1:55 pm, Saturday, 12 September 2026

‎তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রাণচাঞ্চল্যে সুন্দরবন: ১ সেপ্টেম্বর থেকে সবারর জন্য উন্মুক্ত

‎মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও বন উন্মুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে বন বিভাগের কঠোর নজরদারিতে বনের জীববৈচিত্র্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বিচরণ করবে।

‎দীর্ঘ তিন মাসের নীরবতা ও কঠোর বিধিনিষেধ শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটক এবং বনজীবীদের জন্য আবারও উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে সুন্দরবন। গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মাছের প্রজনন ও বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধির সুবিধার্থে ম্যানগ্রোভ বনটিতে সকল ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখা হয়েছিল। এই দীর্ঘ বিরতিতে মানুষের পদচারণা না থাকায় সুন্দরবন তার নিজস্ব ছন্দে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, এই তিন মাসে বনের গহীন অঞ্চলে হরিণের অবাধ বিচরণ, কুমিরের রোদ পোহানো এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে বনের পরিবেশ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত প্রাণবন্ত। বনের অভ্যন্তরে কৃত্রিম শব্দদূষণ ও মানুষের যাতায়াত বন্ধ থাকায় সুন্দরী, গেওয়া ও গরান গাছের চারাগুলোও কোনো বাধা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে, যা বনের সামগ্রিক ঘনত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

‎নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে বন বিভাগের কার্যকর নজরদারি ও বিশেষ অভিযানের ফলে বনের অভ্যন্তরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড গত বছরের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বনরক্ষীরা ৬৩টি অভিযান পরিচালনা করে ৩৯টি মামলা দায়ের করেছে। এই সময়ে বন বিভাগ ৩৭ জন অপরাধীকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে এবং ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা, ৫৫টি জালসহ ছয় হাজারেরও বেশি হরিণ শিকারি ফাঁদ জব্দ করেছে। এছাড়া বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের মতো ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিহত করতে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিষ ও বিষযুক্ত মাছ। জেলে ও বাওয়ালিদের প্রবেশ বন্ধ থাকলেও অসাধু চক্রের তৎপরতা দমনে বন বিভাগের এই কঠোর অবস্থান স্থানীয় বাস্তুসংস্থান রক্ষায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বনের গভীরে যারা নিয়মিত কাজ করেন, তাদের মতে, এবারের নিষেধাজ্ঞা বন্যপ্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্রগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করেছে।

‎সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান বন বিভাগ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্মার্ট পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে দুর্গম এলাকাগুলোতেও নজরদারি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে আকাশপথ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানোয় হরিণ শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী চক্রের দৌরাত্ম্য অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের মতে, বনের ইকোসিস্টেমের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী নীরবতা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, মানবসৃষ্ট চাপ কম থাকায় সুন্দরবন নিজের ক্ষত নিজেই নিরাময় করতে সক্ষম হয়েছে, যা বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা ২০২২ সাল থেকে মৎস্য বিভাগের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে তিন মাসব্যাপী কার্যকর করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বনের সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

‎সুন্দরবন পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার খবরে পর্যটন শিল্পে নতুন আশার সঞ্চার হলেও বন বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে যাতে বনের পরিবেশ আবার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বনজীবীদের পাস-পারমিট প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মাবলি অনুসরণ করা হবে। সুন্দরবনের ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী ও ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ প্রাণীর আবাসন নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং বছরজুড়ে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলে সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে তার সক্ষমতা অটুট রাখতে পারবে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে বনের দরজা খোলার পর পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণই এখন বনের এই সজীবতা ও প্রাণচাঞ্চল্য ধরে রাখার প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

আশুলিয়ায় ‘মমতা স্বেচ্ছায় রক্তদান ফাউন্ডেশন’-এর শুভ উদ্বোধন

‎তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রাণচাঞ্চল্যে সুন্দরবন: ১ সেপ্টেম্বর থেকে সবারর জন্য উন্মুক্ত

Update Time : 05:46:23 pm, Monday, 31 August 2026

‎মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও বন উন্মুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে বন বিভাগের কঠোর নজরদারিতে বনের জীববৈচিত্র্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বিচরণ করবে।

‎দীর্ঘ তিন মাসের নীরবতা ও কঠোর বিধিনিষেধ শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটক এবং বনজীবীদের জন্য আবারও উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে সুন্দরবন। গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মাছের প্রজনন ও বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধির সুবিধার্থে ম্যানগ্রোভ বনটিতে সকল ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখা হয়েছিল। এই দীর্ঘ বিরতিতে মানুষের পদচারণা না থাকায় সুন্দরবন তার নিজস্ব ছন্দে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, এই তিন মাসে বনের গহীন অঞ্চলে হরিণের অবাধ বিচরণ, কুমিরের রোদ পোহানো এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে বনের পরিবেশ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত প্রাণবন্ত। বনের অভ্যন্তরে কৃত্রিম শব্দদূষণ ও মানুষের যাতায়াত বন্ধ থাকায় সুন্দরী, গেওয়া ও গরান গাছের চারাগুলোও কোনো বাধা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে, যা বনের সামগ্রিক ঘনত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

‎নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে বন বিভাগের কার্যকর নজরদারি ও বিশেষ অভিযানের ফলে বনের অভ্যন্তরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড গত বছরের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বনরক্ষীরা ৬৩টি অভিযান পরিচালনা করে ৩৯টি মামলা দায়ের করেছে। এই সময়ে বন বিভাগ ৩৭ জন অপরাধীকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে এবং ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা, ৫৫টি জালসহ ছয় হাজারেরও বেশি হরিণ শিকারি ফাঁদ জব্দ করেছে। এছাড়া বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের মতো ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিহত করতে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিষ ও বিষযুক্ত মাছ। জেলে ও বাওয়ালিদের প্রবেশ বন্ধ থাকলেও অসাধু চক্রের তৎপরতা দমনে বন বিভাগের এই কঠোর অবস্থান স্থানীয় বাস্তুসংস্থান রক্ষায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বনের গভীরে যারা নিয়মিত কাজ করেন, তাদের মতে, এবারের নিষেধাজ্ঞা বন্যপ্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্রগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করেছে।

‎সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান বন বিভাগ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্মার্ট পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে দুর্গম এলাকাগুলোতেও নজরদারি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে আকাশপথ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানোয় হরিণ শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী চক্রের দৌরাত্ম্য অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের মতে, বনের ইকোসিস্টেমের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী নীরবতা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, মানবসৃষ্ট চাপ কম থাকায় সুন্দরবন নিজের ক্ষত নিজেই নিরাময় করতে সক্ষম হয়েছে, যা বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা ২০২২ সাল থেকে মৎস্য বিভাগের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে তিন মাসব্যাপী কার্যকর করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বনের সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

‎সুন্দরবন পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার খবরে পর্যটন শিল্পে নতুন আশার সঞ্চার হলেও বন বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে যাতে বনের পরিবেশ আবার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বনজীবীদের পাস-পারমিট প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মাবলি অনুসরণ করা হবে। সুন্দরবনের ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী ও ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ প্রাণীর আবাসন নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং বছরজুড়ে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলে সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে তার সক্ষমতা অটুট রাখতে পারবে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে বনের দরজা খোলার পর পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণই এখন বনের এই সজীবতা ও প্রাণচাঞ্চল্য ধরে রাখার প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।