4:10 pm, Saturday, 12 September 2026

গডফাদার হাবলু ও হাসান শওকত সিন্ডিকেটে ধ্বংসের প্রান্তে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলে যেন মাফিয়া সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। আর এই মাফিয়া সিন্ডিকেটের নেপথ্যে মূল গডফাদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বিতর্কিত ‘হাবলু’। তার সরাসরি নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণে থেকে অধিদপ্তরের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের নীল নকশা বাস্তবায়ন করছেন ঢাকা মেট্রো সার্কেলের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী) মো. হাসান শওকত। হাবলু-হাসান শওকত জুটির লাগামহীন দুর্নীতি ও হরিলুটের কারণে আজ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।
নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কাজ এক টাকারও না হলেও ভুয়া মেজারমেন্ট বুক (এমবি) ও নথিপত্র তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করাই তাদের মূল কৌশল। শুধু অর্থ লোপাটই নয়, নিজ দপ্তরে বসে বস্তা থেকে কোটি কোটি টাকা বের করে টেবিলের ওপর গুনে গুনে ভাগাভাগি করার চাঞ্চল্যকর ভিডিও চিত্র ও প্রামাণ্য তথ্য সামনে এসেছে।
১০ তলার বিল তুলে কাজ ৮ তলাতেই শেষ
প্রাপ্ত নথির তথ্য প্রমাণে দেখা যায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার ভবনভবন সংলগ্ন শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে ১০ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজটি পায় ‘বিল্ডার্স- সি,ডব্লিউ বি,ডি জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যার নেপথ্যে ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার। ২০২২ সালের ১৩ জুন কোনো কাজ না করেই ৯ম ও ১০ম তলার ভুয়া পরিমাপ দেখিয়ে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার চলতি বিল স্বাক্ষর করে পাস করিয়ে দেন হাসান শওকত।
পরিমাপ বইয়ের (এমবি) ৪৬ থেকে ৯৪ পৃষ্ঠা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব খাতের বিপরীতে টাকা তোলা হয়েছে—যেমন ৯ম ও ১০ম তলার ছাদ ঢালাই (৪৯০,০০০ টাকা), মেম্ব্রেন ওয়াটার প্রুফিং (৭৪৬,৪৫০ টাকা), দেয়ালের ওয়াটার প্রুফিং (৬৫০,০০০ টাকা), সাটারিং, পিলার (৫১৪,০০০ টাকা), লিন্টেল ও রড (৪৯,০০,০০০ টাকা) বাবদ মোট ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা—তার কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি আজও ৮ তলা পর্যন্তই থমকে আছে। পরবর্তীতে সরকারি এই অর্থ অফিসে বসেই বস্তা ভরে ভাগাভাগি করা হয়, যার একটি ভিডিও দৃশ্যে দেখা যায় প্রকৌশলী হাসান শওকতের সামনে টেবিলের ওপর বস্তা থেকে লাখ লাখ টাকা বের করে রাখা হচ্ছে।
যেখানে গেছেন সেখানেই ভুয়া বিলের হরিলুট
গডফাদার হাবলুর মদদে হাসান শওকত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন:
মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: ২০২২ সালের জুনে বিদ্যুৎ লোড বৃদ্ধি ও ремонта জন্য প্রায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ পায় ‘মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ’। কোনো কাজ না করেই ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৮ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে বাকি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ভুয়া বিল করে তুলে নেওয়া হয়।
ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়: ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ তলা ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দিয়ে কোনো কাজ না করেই ১০ লাখ টাকার বিল তুলে নেন হাসান শওকত।
আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ: কোতোয়ালি থানার এই প্রতিষ্ঠানেও কোনো কাজ ছাড়া বিলের ১৯ লাখ টাকার সরকারি তহবিল আত্মসাৎ করা হয়েছে।
নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের পাহাড়
চাকরিজীবনে যেখানেই দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানেই জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা।

তার স্ত্রীর নামে খুলনা ডুমুরিয়া, দিঘলিয়া, মেহেরপুর সদর, মাগুরা সদর এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ও আলিশান জমিদার বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। মেহেরপুর সদরের বিভিন্ন খতিয়ানে ১০৫ শতকের বেশি এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় নিজ ও স্ত্রীর নামে ১০ তলা ভবনসহ মোট ১৮৪.৩৩ শতক জমি ও রিসোর্টের মালিকানা গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে খোলস বদলে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তা এখন গডফাদার হাবলুর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে শিক্ষা খাতের সরকারি তহবিল লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন।

জনপ্রশাসন ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সচেতন মহল অবিলম্বে দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড হাবলু ও তার প্রধান বাস্তবায়নকারী হাসান শওকতকে চাকরিচ্যুত করে বিভাগীয় মামলা দায়ের, অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের কার্যালয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

আশুলিয়ায় ‘মমতা স্বেচ্ছায় রক্তদান ফাউন্ডেশন’-এর শুভ উদ্বোধন

গডফাদার হাবলু ও হাসান শওকত সিন্ডিকেটে ধ্বংসের প্রান্তে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর

Update Time : 10:44:44 am, Tuesday, 18 August 2026

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলে যেন মাফিয়া সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। আর এই মাফিয়া সিন্ডিকেটের নেপথ্যে মূল গডফাদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বিতর্কিত ‘হাবলু’। তার সরাসরি নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণে থেকে অধিদপ্তরের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের নীল নকশা বাস্তবায়ন করছেন ঢাকা মেট্রো সার্কেলের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী) মো. হাসান শওকত। হাবলু-হাসান শওকত জুটির লাগামহীন দুর্নীতি ও হরিলুটের কারণে আজ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।
নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কাজ এক টাকারও না হলেও ভুয়া মেজারমেন্ট বুক (এমবি) ও নথিপত্র তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করাই তাদের মূল কৌশল। শুধু অর্থ লোপাটই নয়, নিজ দপ্তরে বসে বস্তা থেকে কোটি কোটি টাকা বের করে টেবিলের ওপর গুনে গুনে ভাগাভাগি করার চাঞ্চল্যকর ভিডিও চিত্র ও প্রামাণ্য তথ্য সামনে এসেছে।
১০ তলার বিল তুলে কাজ ৮ তলাতেই শেষ
প্রাপ্ত নথির তথ্য প্রমাণে দেখা যায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার ভবনভবন সংলগ্ন শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে ১০ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজটি পায় ‘বিল্ডার্স- সি,ডব্লিউ বি,ডি জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যার নেপথ্যে ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার। ২০২২ সালের ১৩ জুন কোনো কাজ না করেই ৯ম ও ১০ম তলার ভুয়া পরিমাপ দেখিয়ে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার চলতি বিল স্বাক্ষর করে পাস করিয়ে দেন হাসান শওকত।
পরিমাপ বইয়ের (এমবি) ৪৬ থেকে ৯৪ পৃষ্ঠা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব খাতের বিপরীতে টাকা তোলা হয়েছে—যেমন ৯ম ও ১০ম তলার ছাদ ঢালাই (৪৯০,০০০ টাকা), মেম্ব্রেন ওয়াটার প্রুফিং (৭৪৬,৪৫০ টাকা), দেয়ালের ওয়াটার প্রুফিং (৬৫০,০০০ টাকা), সাটারিং, পিলার (৫১৪,০০০ টাকা), লিন্টেল ও রড (৪৯,০০,০০০ টাকা) বাবদ মোট ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা—তার কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি আজও ৮ তলা পর্যন্তই থমকে আছে। পরবর্তীতে সরকারি এই অর্থ অফিসে বসেই বস্তা ভরে ভাগাভাগি করা হয়, যার একটি ভিডিও দৃশ্যে দেখা যায় প্রকৌশলী হাসান শওকতের সামনে টেবিলের ওপর বস্তা থেকে লাখ লাখ টাকা বের করে রাখা হচ্ছে।
যেখানে গেছেন সেখানেই ভুয়া বিলের হরিলুট
গডফাদার হাবলুর মদদে হাসান শওকত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন:
মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: ২০২২ সালের জুনে বিদ্যুৎ লোড বৃদ্ধি ও ремонта জন্য প্রায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ পায় ‘মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ’। কোনো কাজ না করেই ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৮ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে বাকি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ভুয়া বিল করে তুলে নেওয়া হয়।
ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়: ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ তলা ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দিয়ে কোনো কাজ না করেই ১০ লাখ টাকার বিল তুলে নেন হাসান শওকত।
আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ: কোতোয়ালি থানার এই প্রতিষ্ঠানেও কোনো কাজ ছাড়া বিলের ১৯ লাখ টাকার সরকারি তহবিল আত্মসাৎ করা হয়েছে।
নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের পাহাড়
চাকরিজীবনে যেখানেই দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানেই জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা।

তার স্ত্রীর নামে খুলনা ডুমুরিয়া, দিঘলিয়া, মেহেরপুর সদর, মাগুরা সদর এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ও আলিশান জমিদার বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। মেহেরপুর সদরের বিভিন্ন খতিয়ানে ১০৫ শতকের বেশি এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় নিজ ও স্ত্রীর নামে ১০ তলা ভবনসহ মোট ১৮৪.৩৩ শতক জমি ও রিসোর্টের মালিকানা গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে খোলস বদলে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তা এখন গডফাদার হাবলুর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে শিক্ষা খাতের সরকারি তহবিল লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন।

জনপ্রশাসন ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সচেতন মহল অবিলম্বে দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড হাবলু ও তার প্রধান বাস্তবায়নকারী হাসান শওকতকে চাকরিচ্যুত করে বিভাগীয় মামলা দায়ের, অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের কার্যালয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।