10:55 am, Wednesday, 28 October 2026

কোনাবাড়ী সেটেলমেন্টে দুর্নীতির সাম্রাজ্য: কর্মকর্তা-দালাল ও ক্ষমতাসিল নেতাদের সিন্ডিকেটে জিম্মি সেবাগ্রহীতারা, অনুসন্ধানে গিয়ে বাধা ও ঘুষের প্রস্তাবের মুখে সাংবাদিকরা

গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকায় চলমান ভূমি জরিপ (সেটেলমেন্ট) কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ এখন নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ করে, ডাক্তার: আব্দুল সাদেক সাহেবের বাড়ি (নতুন বাজার রোড, পশ্চিম আমবাগ, বাঘিয়া, কোনাবাড়ী, গাজীপুর সদর) সংলগ্ন তসদিক ক্যাম্পে ভূমি জরিপের কার্যক্রম ঘিরে একটি শক্তিশালী সুসংগঠিত দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রটি সাধারণ ভূমি মালিকদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

​সরজমিনে তসদিক ক্যাম্প ও জরিপ অফিসে গিয়ে দেখা যায়, বিআরএস বা জরিপের মাঠ পর্চা সংক্রান্ত সরকারি কাজের নামে প্রকাশ্যে চলছে দরকষাকষি। ভুয়া ও কৃত্রিম ভুল দেখিয়ে ফাইল আটকে রেখে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে কাজ আটকে রাখা এবং চরম হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

​সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, এক অসহায় নারী তার জমির মাঠ পর্চা সংশোধন করতে এসে পেশকার কর্তৃক অর্থ দাবির মুখে কান কান্নায় ভেঙে পড়েন। অফিসে টাকা দিতে না পারায় সিঁড়িতে বসে কাঁদছিলেন ওই নারী। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পেশকার (অফিস সহকারী) ইমাম হোসেন এবং পেশকার হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘুষ দাবি ও দালালাদের সমন্বয়ে অর্থ আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। ইমাম হোসেনের মৌন সমর্থনে দালালেরা প্রকাশ্যে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, যার ভিডিও চিত্রও সাংবাদিকদের হস্তগত হয়েছে।

​সংবাদমাধ্যমে পূর্বে “কোনাবাড়ী জরিপ অফিসে দুর্নীতির অভিযোগ” এবং “পেশকার হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ” সংক্রান্ত খবর প্রকাশের পর অনুসন্ধানে নামেন একদল সাংবাদিক। কিন্তু সেটেলমেন্ট অফিসে প্রতিদিন সকাল-বিকাল অবস্থান করা বিএনপি নেতা পরিচয়দানকারী আব্দুল আজিজ সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

​সাংবাদিকরা তার উপস্থিতির কারণ ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং ঘুষ বাণিজ্যে সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি সহসা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন এবং মারমুখী আচরণ করেন। তিনি সাংবাদিকদের উল্টো ধমক দিয়ে বলেন, “আপনারা কেন আসেন এখানে? আপনাদের কাজ কি?”

​মীমাংসার নামে ঘুষের অফার: ‘১৫ দিন পর পর এসে টাকা নিয়ে যাবেন’
​ঘটনার একপর্যায়ে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নিতে আব্দুল আজিজ বিএনপি’র থানা পর্যায়ের সভাপতি ইদ্রিস সাহেবকে ডেকে আনেন। ইদ্রিস সাহেব এবং এলাকার প্রভাবশালী আবু সাঈদ এক ব্যক্তি এসে সাংবাদিক ও সেটেলমেন্ট অফিসের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ও ‘মিল-তাল’ করে দেওয়ার চেষ্টা চালান।

​পরবর্তীতে ইদ্রিস সাহেবের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী কাজ বন্ধ রাখার বিনিময়ে এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “আপনারা ১৫ দিন পর পর সেটেলমেন্ট অফিসে এসে ভিজিটিং কার্ড জমা দিয়ে টাকা নিয়ে যাবেন।”

​সাংবাদিকদের চুপ করাতে রাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে নিয়মিত টাকা দেওয়ার এমন প্রকাশ্য প্রস্তাবে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।

​অনুসন্ধানের দ্বিতীয় অধ্যায়
​সেটেলমেন্ট অফিসের কর্মকর্তা, পেশকার (ইমাম হোসেন, হেলাল উদ্দিন), দালাল চক্র এবং স্থানীয় বিএনপি নেতাদের এমন ত্রিভূজ জোট সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত মৌলিক সেবাকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের শিকড় কতদূর বিস্তৃত—তা উদ্ঘাটনে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

স্থানী সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে এই সেটেলমেন্ট ক্যাম্পগুলোতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গাজীপুর জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) জরুরি হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কেশবপুরে দুঃস্থ, অসহায় ও গৃহহীনদের মাঝে বিশেষ অনুদান প্রদান

কোনাবাড়ী সেটেলমেন্টে দুর্নীতির সাম্রাজ্য: কর্মকর্তা-দালাল ও ক্ষমতাসিল নেতাদের সিন্ডিকেটে জিম্মি সেবাগ্রহীতারা, অনুসন্ধানে গিয়ে বাধা ও ঘুষের প্রস্তাবের মুখে সাংবাদিকরা

Update Time : 08:25:42 pm, Saturday, 19 September 2026

গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকায় চলমান ভূমি জরিপ (সেটেলমেন্ট) কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ এখন নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ করে, ডাক্তার: আব্দুল সাদেক সাহেবের বাড়ি (নতুন বাজার রোড, পশ্চিম আমবাগ, বাঘিয়া, কোনাবাড়ী, গাজীপুর সদর) সংলগ্ন তসদিক ক্যাম্পে ভূমি জরিপের কার্যক্রম ঘিরে একটি শক্তিশালী সুসংগঠিত দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রটি সাধারণ ভূমি মালিকদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

​সরজমিনে তসদিক ক্যাম্প ও জরিপ অফিসে গিয়ে দেখা যায়, বিআরএস বা জরিপের মাঠ পর্চা সংক্রান্ত সরকারি কাজের নামে প্রকাশ্যে চলছে দরকষাকষি। ভুয়া ও কৃত্রিম ভুল দেখিয়ে ফাইল আটকে রেখে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে কাজ আটকে রাখা এবং চরম হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

​সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, এক অসহায় নারী তার জমির মাঠ পর্চা সংশোধন করতে এসে পেশকার কর্তৃক অর্থ দাবির মুখে কান কান্নায় ভেঙে পড়েন। অফিসে টাকা দিতে না পারায় সিঁড়িতে বসে কাঁদছিলেন ওই নারী। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পেশকার (অফিস সহকারী) ইমাম হোসেন এবং পেশকার হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘুষ দাবি ও দালালাদের সমন্বয়ে অর্থ আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। ইমাম হোসেনের মৌন সমর্থনে দালালেরা প্রকাশ্যে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, যার ভিডিও চিত্রও সাংবাদিকদের হস্তগত হয়েছে।

​সংবাদমাধ্যমে পূর্বে “কোনাবাড়ী জরিপ অফিসে দুর্নীতির অভিযোগ” এবং “পেশকার হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ” সংক্রান্ত খবর প্রকাশের পর অনুসন্ধানে নামেন একদল সাংবাদিক। কিন্তু সেটেলমেন্ট অফিসে প্রতিদিন সকাল-বিকাল অবস্থান করা বিএনপি নেতা পরিচয়দানকারী আব্দুল আজিজ সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

​সাংবাদিকরা তার উপস্থিতির কারণ ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং ঘুষ বাণিজ্যে সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি সহসা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন এবং মারমুখী আচরণ করেন। তিনি সাংবাদিকদের উল্টো ধমক দিয়ে বলেন, “আপনারা কেন আসেন এখানে? আপনাদের কাজ কি?”

​মীমাংসার নামে ঘুষের অফার: ‘১৫ দিন পর পর এসে টাকা নিয়ে যাবেন’
​ঘটনার একপর্যায়ে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নিতে আব্দুল আজিজ বিএনপি’র থানা পর্যায়ের সভাপতি ইদ্রিস সাহেবকে ডেকে আনেন। ইদ্রিস সাহেব এবং এলাকার প্রভাবশালী আবু সাঈদ এক ব্যক্তি এসে সাংবাদিক ও সেটেলমেন্ট অফিসের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ও ‘মিল-তাল’ করে দেওয়ার চেষ্টা চালান।

​পরবর্তীতে ইদ্রিস সাহেবের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী কাজ বন্ধ রাখার বিনিময়ে এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “আপনারা ১৫ দিন পর পর সেটেলমেন্ট অফিসে এসে ভিজিটিং কার্ড জমা দিয়ে টাকা নিয়ে যাবেন।”

​সাংবাদিকদের চুপ করাতে রাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে নিয়মিত টাকা দেওয়ার এমন প্রকাশ্য প্রস্তাবে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।

​অনুসন্ধানের দ্বিতীয় অধ্যায়
​সেটেলমেন্ট অফিসের কর্মকর্তা, পেশকার (ইমাম হোসেন, হেলাল উদ্দিন), দালাল চক্র এবং স্থানীয় বিএনপি নেতাদের এমন ত্রিভূজ জোট সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত মৌলিক সেবাকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের শিকড় কতদূর বিস্তৃত—তা উদ্ঘাটনে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

স্থানী সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে এই সেটেলমেন্ট ক্যাম্পগুলোতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গাজীপুর জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) জরুরি হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।