5:05 pm, Saturday, 12 September 2026

বাঁশের গুঁড়ায় মিলল হত্যার সূত্র: ভাণ্ডারিয়ায় ইসমাইল শরীফ হত্যা মামলায় স্ত্রী-তিন ছেলে গ্রেপ্তার

108

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকায় ইসমাইল শরীফ (৬০) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনাটির রহস্য উন্মোচন করে নিহতের স্ত্রী ও তিন ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে সন্দেহভাজন রক্তমাখা একটি কুড়ালও জব্দ করা হয়েছে।

সোমবার (১০ আগস্ট) ভাণ্ডারিয়া থানায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৯ আগস্ট সকালে তেলিখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাইনামার্ট এলাকার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন স্থান থেকে ইসমাইল শরীফের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে ওসি দেওয়ান জগলুল হাসানের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে পাঠায়, নিহত ইসমাইল শরীফ উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা গ্রামের বাসিন্দা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগের দিন পারিবারিক বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। পরে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরদিন সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই তদন্তে নামে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগম (৫০) এবং তিন ছেলে রুবেল শরীফ (৩০), রাসেল শরীফ (২৪) ও রোমান শরীফকে (১৯) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়। প্রথমদিকে তারা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করলেও তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল ও আশপাশ থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান।

প্রেস ব্রিফিংয়ে ওসি জানান, ঘটনাস্থলের ছবি পর্যালোচনার সময় নিহতের মাথা ও কানের পাশে কাঠখেকো পোকার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশের গুঁড়ার মতো কিছু কণা দেখতে পান তদন্তকারীরা। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান চালালে নিহতের বাড়ির বারান্দার সামনে একই ধরনের গুঁড়া, মাটির ফ্লোরে রক্তের দাগ এবং ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া যায়। এতে পুলিশের সন্দেহ হয় যে হত্যাকাণ্ডটি অন্য কোথাও নয়, বরং বাড়ির ভেতরেই সংঘটিত হয়েছে।

পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই পুনরায় ঘটনাস্থলে অভিযান চালানো হয়। এ সময় সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটও তদন্তে অংশ নেয়। তাদের উপস্থিতিতে ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে সন্দেহভাজন একটি রক্তমাখা কুড়াল উদ্ধার করা হয়।

সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে রক্তের নমুনা, কুড়ালসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। এছাড়া নিহতের স্ত্রীর শরীরেও রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সংগৃহীত নমুনা ও আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।

ভান্ডারিয়া থানার প্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান বলেন, ঘটনার পরপরই আমরা প্রযুক্তিগত সহায়তা, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সূত্র অনুসরণ করেই অল্প সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক কলহ ও দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য অল্প সময়ের মধ্যে উদঘাটন এবং চারজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল এবং আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই ঘটনার চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

আশুলিয়ায় ‘মমতা স্বেচ্ছায় রক্তদান ফাউন্ডেশন’-এর শুভ উদ্বোধন

বাঁশের গুঁড়ায় মিলল হত্যার সূত্র: ভাণ্ডারিয়ায় ইসমাইল শরীফ হত্যা মামলায় স্ত্রী-তিন ছেলে গ্রেপ্তার

Update Time : 04:56:00 pm, Monday, 10 August 2026
108

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকায় ইসমাইল শরীফ (৬০) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনাটির রহস্য উন্মোচন করে নিহতের স্ত্রী ও তিন ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে সন্দেহভাজন রক্তমাখা একটি কুড়ালও জব্দ করা হয়েছে।

সোমবার (১০ আগস্ট) ভাণ্ডারিয়া থানায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৯ আগস্ট সকালে তেলিখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাইনামার্ট এলাকার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন স্থান থেকে ইসমাইল শরীফের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে ওসি দেওয়ান জগলুল হাসানের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে পাঠায়, নিহত ইসমাইল শরীফ উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা গ্রামের বাসিন্দা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগের দিন পারিবারিক বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। পরে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরদিন সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই তদন্তে নামে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগম (৫০) এবং তিন ছেলে রুবেল শরীফ (৩০), রাসেল শরীফ (২৪) ও রোমান শরীফকে (১৯) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়। প্রথমদিকে তারা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করলেও তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল ও আশপাশ থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান।

প্রেস ব্রিফিংয়ে ওসি জানান, ঘটনাস্থলের ছবি পর্যালোচনার সময় নিহতের মাথা ও কানের পাশে কাঠখেকো পোকার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশের গুঁড়ার মতো কিছু কণা দেখতে পান তদন্তকারীরা। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান চালালে নিহতের বাড়ির বারান্দার সামনে একই ধরনের গুঁড়া, মাটির ফ্লোরে রক্তের দাগ এবং ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া যায়। এতে পুলিশের সন্দেহ হয় যে হত্যাকাণ্ডটি অন্য কোথাও নয়, বরং বাড়ির ভেতরেই সংঘটিত হয়েছে।

পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই পুনরায় ঘটনাস্থলে অভিযান চালানো হয়। এ সময় সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটও তদন্তে অংশ নেয়। তাদের উপস্থিতিতে ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে সন্দেহভাজন একটি রক্তমাখা কুড়াল উদ্ধার করা হয়।

সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে রক্তের নমুনা, কুড়ালসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। এছাড়া নিহতের স্ত্রীর শরীরেও রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সংগৃহীত নমুনা ও আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।

ভান্ডারিয়া থানার প্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান বলেন, ঘটনার পরপরই আমরা প্রযুক্তিগত সহায়তা, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সূত্র অনুসরণ করেই অল্প সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক কলহ ও দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য অল্প সময়ের মধ্যে উদঘাটন এবং চারজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল এবং আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই ঘটনার চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।