2:01 am, Tuesday, 2 June 2026

অভাবকে হার মানিয়ে ফটিকছড়ির আশুতোষ এখন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষক।

109

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষক হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন আশুতোষ নাথ। অদম্য পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আর পরিবারের ত্যাগের অনন্য এক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।

আশুতোষ নাথের জন্ম ফটিকছড়ির একটি অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে। পরে জীবিকার তাগিদে তার পরিবার খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলায় চলে যায়। বাবা মিলন নাথ ভ্রাম্যমাণ ধানভাঙা মেশিন চালিয়ে কোনো রকমে পাঁচ সন্তানের সংসার চালাতেন। পরিবারের নিত্যসঙ্গী ছিল অভাব-অনটন। সন্তানদের ইচ্ছা পূরণ তো দূরের কথা, ঠিকমতো পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়াও ছিল কঠিন।

তবে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল আশুতোষের। সেই স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তার বড় ভাই পরিতোষ নাথ। সেলাইয়ের কাজ করে যা আয় করতেন, তার বড় অংশই ব্যয় করতেন ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার পেছনে। অন্যদিকে আশুতোষও বাবার কাজে সহায়তা করতেন এবং পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন।

মানিকছড়ির রানী নিহার দেবী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং গিড়ী মৈত্রী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি চট্টগ্রাম শহরের হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ এ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি চকবাজারের একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ শুরু করেন। কম্পোজ, গ্রাফিক্স ডিজাইনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি তখন থেকেই পরিবারকেও সহায়তা করতে শুরু করেন।

স্নাতক তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় অফিস অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে আবেদন করেন। ২০১৬ সালে চাকরি পেয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। সীমিত বেতনে ঢাকায় জীবনযাপন ছিল কঠিন। তাই দিনের চাকরির পাশাপাশি রাতভর ফ্রিল্যান্সিং করতেন তিনি। এভাবেই ধীরে ধীরে পরিবারের আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর কঠোর পরিশ্রম ও মেধার জোরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এ স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের সুযোগ পান আশুতোষ। বুয়েটে পড়ার সময় গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় তার। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেন।

এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে আবেদন শুরু করেন। অবশেষে পূর্ণ স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের University of Massachusetts Boston এ পিএইচডি করার সুযোগ পান তিনি। বর্তমানে সেখানে মেডিসিন ও সিনথেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করছেন। পাশাপাশি শিক্ষা সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

অফিস সহকারী থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে পৌঁছানোর এই দীর্ঘ যাত্রায় আশুতোষ নাথের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার অদম্য চেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম এবং কখনো হাল না ছাড়ার মানসিকতা। তার জীবনের গল্প আজ অসংখ্য তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

ফটিকছড়ি নাজিরহাট পৌরসভার সম্পত্তির বিরোধে হামলা ও ভাঙচুর, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ

অভাবকে হার মানিয়ে ফটিকছড়ির আশুতোষ এখন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষক।

Update Time : 11:14:24 pm, Monday, 18 May 2026
109

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষক হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন আশুতোষ নাথ। অদম্য পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আর পরিবারের ত্যাগের অনন্য এক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।

আশুতোষ নাথের জন্ম ফটিকছড়ির একটি অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে। পরে জীবিকার তাগিদে তার পরিবার খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলায় চলে যায়। বাবা মিলন নাথ ভ্রাম্যমাণ ধানভাঙা মেশিন চালিয়ে কোনো রকমে পাঁচ সন্তানের সংসার চালাতেন। পরিবারের নিত্যসঙ্গী ছিল অভাব-অনটন। সন্তানদের ইচ্ছা পূরণ তো দূরের কথা, ঠিকমতো পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়াও ছিল কঠিন।

তবে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল আশুতোষের। সেই স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তার বড় ভাই পরিতোষ নাথ। সেলাইয়ের কাজ করে যা আয় করতেন, তার বড় অংশই ব্যয় করতেন ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার পেছনে। অন্যদিকে আশুতোষও বাবার কাজে সহায়তা করতেন এবং পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন।

মানিকছড়ির রানী নিহার দেবী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং গিড়ী মৈত্রী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি চট্টগ্রাম শহরের হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ এ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি চকবাজারের একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ শুরু করেন। কম্পোজ, গ্রাফিক্স ডিজাইনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি তখন থেকেই পরিবারকেও সহায়তা করতে শুরু করেন।

স্নাতক তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় অফিস অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে আবেদন করেন। ২০১৬ সালে চাকরি পেয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। সীমিত বেতনে ঢাকায় জীবনযাপন ছিল কঠিন। তাই দিনের চাকরির পাশাপাশি রাতভর ফ্রিল্যান্সিং করতেন তিনি। এভাবেই ধীরে ধীরে পরিবারের আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর কঠোর পরিশ্রম ও মেধার জোরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এ স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের সুযোগ পান আশুতোষ। বুয়েটে পড়ার সময় গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় তার। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেন।

এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে আবেদন শুরু করেন। অবশেষে পূর্ণ স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের University of Massachusetts Boston এ পিএইচডি করার সুযোগ পান তিনি। বর্তমানে সেখানে মেডিসিন ও সিনথেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করছেন। পাশাপাশি শিক্ষা সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

অফিস সহকারী থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে পৌঁছানোর এই দীর্ঘ যাত্রায় আশুতোষ নাথের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার অদম্য চেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম এবং কখনো হাল না ছাড়ার মানসিকতা। তার জীবনের গল্প আজ অসংখ্য তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।