
ভূমিকা
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (Autism Spectrum Disorder—ASD) হলো একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থা, যেখানে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, ভাষা, আচরণ, আগ্রহ এবং সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ধরনে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। অটিজমের কোনো একক কারণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী, জেনেটিক, মস্তিষ্কের প্রাথমিক বিকাশ এবং কিছু জৈবিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি—একাধিক উপাদান পরস্পরের সঙ্গে মিলে অটিজমের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। (World Health Organization)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো শিশুর ক্ষেত্রে একটি ঝুঁকির কারণ থাকলেই তার অটিজম হবে, এমন নয়। আবার কোনো পরিচিত ঝুঁকি না থাকলেও শিশুর অটিজম হতে পারে।
⸻
১. অটিজমের মূল ভিত্তি কোথায়?
গবেষণায় দেখা যায়, অটিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের বিকাশগত কিছু পার্থক্য জন্মের আগেই বা জীবনের একেবারে প্রথম দিকে শুরু হতে পারে।
শিশুর মস্তিষ্কে কোটি কোটি নিউরনের মধ্যে যোগাযোগ ও সংযোগ তৈরি হয়। এই সংযোগগুলোর বিকাশ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, ভাষা, সামাজিক সংকেত বোঝা এবং সংবেদনশীল তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করে।
জেনেটিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রাথমিক মস্তিষ্কের বিকাশের পারস্পরিক প্রভাবের কারণে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এই বিকাশের ধরন অন্য শিশুদের তুলনায় আলাদা হতে পারে। (World Health Organization)
⸻
২. জেনেটিক কারণ
অটিজমের ক্ষেত্রে জেনেটিক উপাদান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একাধিক জিনের পরিবর্তন বা বৈচিত্র্য মস্তিষ্কের বিকাশ ও স্নায়ুকোষের যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জেনেটিক বা ক্রোমোজোম-সম্পর্কিত অবস্থার সঙ্গে ASD-এর সম্পর্ক পাওয়া যায়।
উদাহরণ হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে—
* Fragile X syndrome
* Tuberous sclerosis
* অন্যান্য জেনেটিক/ক্রোমোজোমাল পরিবর্তন
অটিজমের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। পরিবারের একজন সন্তানের ASD থাকলে অন্য সন্তানের ASD হওয়ার সম্ভাবনাও সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় বেশি হতে পারে। (CDC)
তবে “অটিজম শুধু বংশগত রোগ”—এমন ধারণাও সঠিক নয়। কারণ জেনেটিক প্রভাবের সঙ্গে অন্যান্য জৈবিক ও পরিবেশগত বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।
⸻
৩. গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্য
গর্ভাবস্থায় মায়ের শারীরিক ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের কিছু বিষয় শিশুর নিউরোডেভেলপমেন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
গবেষণায় বিশেষভাবে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—
* গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
* কিছু গুরুতর মাতৃস্বাস্থ্য সমস্যা
* নির্দিষ্ট সংক্রমণ
* গর্ভাবস্থায় কিছু জটিলতা
* গর্ভকালীন কিছু ওষুধের সংস্পর্শ
তবে এগুলোকে অটিজমের সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। এগুলো মূলত সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। (World Health Organization)
⸻
৪. গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট ওষুধের সংস্পর্শ
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের গর্ভকালীন সংস্পর্শ এবং ASD-এর ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
বিশেষ করে valproate-এর মতো কিছু অ্যান্টি-সিজার/অ্যান্টি-এপিলেপটিক ওষুধের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা রয়েছে। WHO-ও গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট ওষুধের সংস্পর্শকে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। (World Health Organization)
তবে এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো:
গর্ভবতী নারী নিজের ইচ্ছায় কোনো প্রয়োজনীয় ওষুধ বন্ধ করবেন না। ওষুধের প্রয়োজন, উপকার ও ঝুঁকি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
⸻
৫. মাতৃবয়স ও পিতৃবয়স
বাবা-মায়ের তুলনামূলক বেশি বয়সে সন্তান ধারণের সঙ্গে ASD-এর ঝুঁকির কিছু পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক গবেষণায় পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বেশি বয়সী বাবা-মায়ের সন্তান অটিস্টিক হবেই। এটি কেবল সম্ভাব্য ঝুঁকি-উপাদান, নিশ্চিত কারণ নয়। (World Health Organization)
⸻
৬. প্রি-টার্ম বা অকাল জন্ম
সময়ের আগেই জন্ম নেওয়া শিশু এবং খুব কম জন্ম ওজনের শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
অটিজমের ক্ষেত্রেও prematurity এবং low birth weight সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে। (World Health Organization)
তবে এটিও মনে রাখতে হবে—প্রি-টার্ম জন্ম মানেই অটিজম হবে না।
⸻
৭. জন্মের সময় গুরুতর জটিলতা
কিছু গুরুতর জন্মকালীন জটিলতা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
যেমন—
* গুরুতর জন্মকালীন জটিলতা
* নবজাতকের গুরুতর শারীরিক সমস্যা
* অত্যন্ত কম জন্ম ওজন
* কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী অক্সিজেন-সংক্রান্ত জটিলতা
এসব বিষয়কে ASD-এর সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে গবেষণা করা হয়েছে। (World Health Organization)
⸻
৮. পরিবেশগত দূষণ
গর্ভকালীন সময়ে বায়ুদূষণ ও কিছু ভারী ধাতুর সংস্পর্শ নিয়ে অটিজমের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে গবেষণা হয়েছে।
তবে এখানে আবারও বলা প্রয়োজন—পরিবেশগত কোনো একটি দূষককে অটিজমের একক কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। বিষয়টি জটিল এবং জেনেটিক ও অন্যান্য জৈবিক উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। (World Health Organization)
⸻
৯. জন্মের পর ০–১ বছর
জন্মের পর প্রথম বছরটি শিশুর মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশের সময়।
এই সময়ে বাবা-মায়ের উচিত শিশুর—
* চোখে চোখ রাখার চেষ্টা
* মানুষের মুখের দিকে তাকানো
* শব্দে প্রতিক্রিয়া
* হাসি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
* নাম ধরে ডাকলে সাড়া
* অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার
* বাবা-মায়ের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ
এসব বিষয় লক্ষ্য করা।
কোনো একটি আচরণ দেখে অটিজমের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তবে একাধিক বিকাশগত লক্ষণ থাকলে দ্রুত শিশুর developmental assessment করা গুরুত্বপূর্ণ।
⸻
১০. ১–২ বছর বয়স
এই বয়সে শিশুর ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগ দ্রুত বিকশিত হওয়ার কথা।
কিছু সতর্কতামূলক লক্ষণ হতে পারে—
* নাম ধরে ডাকলে বারবার সাড়া না দেওয়া
* ইশারা করে কিছু দেখানো কম
* নিজের প্রয়োজন বোঝাতে অঙ্গভঙ্গি কম ব্যবহার
* সামাজিক যোগাযোগে আগ্রহ কম
* শব্দ বা কথা শেখার ক্ষেত্রে বিলম্ব
* শেখা শব্দ হারিয়ে ফেলা
* একই ধরনের আচরণ বারবার করা
* খেলায় অস্বাভাবিক পুনরাবৃত্তি
তবে এগুলোর কোনো একটি থাকলেই অটিজম নিশ্চিত নয়।
⸻
১১. ২–৩ বছর বয়স
এই বয়সে সামাজিক ও ভাষাগত পার্থক্য অনেক সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে—
সামাজিক যোগাযোগে
* অন্য শিশুর সঙ্গে খেলায় আগ্রহ কম
* আনন্দ বা আগ্রহ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া কম
* মুখের অভিব্যক্তি ও সামাজিক সংকেত বুঝতে অসুবিধা
ভাষায়
* কথা বলতে দেরি
* একই শব্দ বা বাক্য বারবার বলা
* কথোপকথন চালিয়ে যেতে অসুবিধা
* প্রয়োজনের তুলনায় ভাষার ব্যবহার ভিন্ন ধরনের হওয়া
আচরণে
* একই কাজ বারবার করা
* নির্দিষ্ট রুটিন পরিবর্তন হলে অতিরিক্ত অস্বস্তি
* কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা বিষয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেশি আগ্রহ
⸻
১২. ৩–৫ বছর বয়স
৩ থেকে ৫ বছর বয়সে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, কল্পনাভিত্তিক খেলা, ভাষা ও আচরণের পার্থক্য আরও পরিষ্কার হতে পারে।
এই বয়সে দেখা যেতে পারে—
* সমবয়সীদের সঙ্গে পারস্পরিক খেলায় অসুবিধা
* pretend play বা কল্পনাভিত্তিক খেলায় সীমাবদ্ধতা
* সামাজিক নিয়ম বুঝতে সমস্যা
* কথোপকথনে পারস্পরিকতা কম
* নির্দিষ্ট বিষয়ে অত্যধিক আগ্রহ
* পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ
* শব্দ, আলো, স্পর্শ, গন্ধ বা খাবারের texture-এর প্রতি অতিরিক্ত বা কম সংবেদনশীলতা
তবে প্রতিটি শিশুর বিকাশের ধরন আলাদা। তাই মূল্যায়নের সময় শিশুর সামগ্রিক বিকাশ ও কার্যক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
⸻
১৩. অটিজম কি মোবাইল বা টেলিভিশনের কারণে হয়?
মোবাইল, টেলিভিশন বা স্ক্রিনকে অটিজমের সরাসরি কারণ হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি।
তবে ছোট শিশুদের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত screen time তাদের ভাষা, মনোযোগ, ঘুম, খেলাধুলা ও সামাজিক পারস্পরিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই শিশুর সঙ্গে—
কথা বলা + খেলাধুলা + বই পড়া + চোখে চোখ রাখা + সামাজিক যোগাযোগ
এসবকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
⸻
১৪. অটিজম কি বাবা-মায়ের ভুলের কারণে হয়?
না।
অটিজমকে বাবা-মায়ের ভালোবাসার অভাব, খারাপ parenting বা শিশুকে যথেষ্ট সময় না দেওয়ার ফল হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। WHO স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে autism bad parenting-এর কারণে হয় না। (World Health Organization)
অভিভাবককে দোষারোপ না করে শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
⸻
১৫. টিকা কি অটিজম সৃষ্টি করে?
বর্তমান উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অনুযায়ী টিকা অটিজম সৃষ্টি করে না।
WHO-এর সর্বশেষ ২০২৬ সালের evidence review-ও বলছে, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণাগুলো টিকা—থিমেরোসালযুক্ত টিকাসহ—এবং ASD-এর মধ্যে কোনো causal relationship সমর্থন করে না। (World Health Organization)
অতএব অটিজমের ভয়ে শিশুর প্রয়োজনীয় টিকা বন্ধ করা উচিত নয়।
⸻
১৬. গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল কি অটিজমের কারণ?
এ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও WHO জানিয়েছে, বর্তমানে প্যারাসিটামল/acetaminophen এবং অটিজমের মধ্যে নিশ্চিত causal relationship-এর প্রমাণ নেই। (World Health Organization)
গর্ভাবস্থায় যেকোনো ওষুধ প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিত।
⸻
১৭. তাহলে অটিজমের প্রকৃত কারণ কী?
বর্তমান বৈজ্ঞানিক অবস্থানকে সহজভাবে বলা যায়:
অটিজম = একটি মাত্র কারণ নয়।
বরং—
জেনেটিক বৈশিষ্ট্য
+
প্রাথমিক মস্তিষ্কের বিকাশ
+
জৈবিক উপাদান
+
কিছু গর্ভকালীন/জন্মকালীন ঝুঁকি
+
সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব
—এসবের জটিল পারস্পরিক সম্পর্ক কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ASD-এর সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
এখনও গবেষণা চলছে এবং সব শিশুর ক্ষেত্রে একই কারণ পাওয়া যায় না। (World Health Organization)
⸻
১৮. অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
কোনো শিশুর মধ্যে—
* ভাষার বিকাশে বিলম্ব,
* সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা,
* নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া,
* চোখে চোখ রাখার সমস্যা,
* পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ,
* সংবেদনশীলতার অস্বাভাবিকতা,
* অথবা আগে অর্জিত কোনো দক্ষতা হারিয়ে যাওয়া
দেখা গেলে “আরও বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে” বলে দীর্ঘদিন অপেক্ষা না করে শিশুর বিকাশগত মূল্যায়ন করানো উচিত।
অটিজমের ক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি শিশুর প্রয়োজন বোঝা যায়, তত দ্রুত উপযুক্ত সহায়তা—যেমন speech and language support, occupational therapy, developmental intervention, special education এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা—পরিকল্পনা করা যায়। CDC-ও early intervention-এর মাধ্যমে শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ উন্নতির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে। (CDC)
⸻
উপসংহার
অটিজম কোনো একক ভুল, কোনো একটি খাবার, কোনো একটি ওষুধ কিংবা বাবা-মায়ের ব্যর্থতার ফল নয়। এটি শিশুর মস্তিষ্ক ও বিকাশের একটি জটিল ও বৈচিত্র্যময় অবস্থা।
ড. নাছিমা ইসলাম চৌধুরী বৃষ্টি 



















