
সিরাজগঞ্জ: যমুনার বুকজুড়ে বিস্তৃত জলরাশি, ঢেউয়ের ছন্দ, দিগন্তজোড়া বালুচর আর দূরে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর মনোরম দৃশ্য—সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের নাম সিরাজগঞ্জের চায়না বাঁধ। একসময় যমুনার ভাঙন থেকে শহর রক্ষার লক্ষ্যে নির্মিত এ বাঁধ এখন পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। বিকেলের সোনালি আলোয় নদীর সৌন্দর্য উপভোগ, নৌভ্রমণ, বন্ধু-পরিজন নিয়ে আড্ডা কিংবা নদীর নির্মল বাতাসে কিছুটা সময় কাটাতে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসেন নানা বয়সী মানুষ। স্থানীয়দের কাছে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিত স্থানটি এখন সিরাজগঞ্জের বিনোদন ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র।
যমুনার ভাঙন সিরাজগঞ্জ শহরের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বড় উদ্বেগের কারণ। নদীর আগ্রাসন থেকে শহর রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হয়েছে নানা প্রকৌশলগত উদ্যোগ। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নির্মিত ক্রসবার-৩ বাঁধই মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে চায়না বাঁধ নামে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নির্মিত প্রায় ১ হাজার ৭৮২ মিটার দীর্ঘ এ বাঁধের মূল উদ্দেশ্য ছিল নদীশাসন ও তীর রক্ষায় ভূমিকা রাখা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঁধের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, যমুনার বিশাল জলরাশি এবং দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য একে দিয়েছে নতুন পরিচয়।
চায়না বাঁধের সৌন্দর্য ঋতুভেদে বদলে যায়। বর্ষায় যমুনা যখন পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন বাঁধের দুই পাশে বিস্তৃত জলরাশি দেখে মনে হয় যেন নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে কোনো জলপথ। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে বাঁধের পাথুরে গায়ে, আর নদীর বুক থেকে বয়ে আসা বাতাস এনে দেয় প্রশান্তির অনুভূতি। অন্যদিকে বর্ষা শেষে নদীর পানি কমে গেলে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ বালুচর। কোথাও কোথাও ফুটে ওঠা কাশফুল, নীল আকাশ ও সাদা মেঘ মিলে তৈরি করে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য। এ সময় প্রকৃতিপ্রেমী ও ছবি তুলতে আগ্রহী দর্শনার্থীদের কাছে স্থানটি হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।
বাঁধের কাছের হার্ট ভিউ পয়েন্ট থেকেও উপভোগ করা যায় বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য। সেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল এবং সন্ধ্যায় আলোকসজ্জার দৃশ্য পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দেয়। নদীর বুকে নৌভ্রমণও এখানে আসা মানুষের অন্যতম আকর্ষণ। ছোট-বড় নৌকায় যমুনার ঢেউয়ের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে দর্শনার্থীরা ভুলে থাকতে চান শহুরে জীবনের ব্যস্ততা। পাশাপাশি বাঁধের আশপাশে থাকা বায়ুকলগুলোও অনেকের আগ্রহের কেন্দ্র। প্রকৃতি, নদী ও নির্মাণশৈলীর সম্মিলন এ স্থানকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে চায়না বাঁধের পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। বাঁধের আশপাশে বসে খাবারের দোকান, চায়ের আড্ডা আর দর্শনার্থীদের পদচারণায় তৈরি হয় উৎসবমুখর আবহ। চা, ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি ও ভেলপুরিসহ নানা ধরনের খাবারের স্বাদ নিতে নিতে অনেকে উপভোগ করেন যমুনার বাতাস ও সূর্যাস্তের দৃশ্য। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষ থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণী—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
তবে পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হয়ে উঠেছে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যাতায়াতের সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় পর্যটনসেবা নিশ্চিত করা গেলে চায়না বাঁধ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নদীর তীর ও বাঁধের পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। যমুনার ভাঙন মোকাবিলার ইতিহাসের সঙ্গে প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যের এই মেলবন্ধন এখন সিরাজগঞ্জের মানুষের গর্ব। যথাযথ পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে চায়না বাঁধ হয়ে উঠতে পারে দেশের উত্তরাঞ্চলের পর্যটন বিকাশে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য।
আল মাহমুদ, নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ 

























