
যে দেশকে ভালোবাসা যায়, তার সৌন্দর্য শুধু চোখে ধরা পড়ে না—অনুভবেও ধরা দেয়।”
বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে এমন কিছু স্থাপনা রয়েছে, যা কেবল ইট, পাথর, লোহা কিংবা কংক্রিটের সমষ্টি নয়; বরং একটি জাতির আত্মবিশ্বাস, সাহস, স্বপ্ন ও সক্ষমতার প্রতীক। পদ্মা সেতু তেমনই এক মহাকাব্যিক সৃষ্টি। আর সেই সেতুর পথে ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে পড়ন্ত বিকেলের একটি যাত্রা যেন বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একসঙ্গে অনুভব করার বিরল সুযোগ এনে দেয়।
বিকেলের সোনালি আলো যখন ধীরে ধীরে প্রকৃতির বুকে নেমে আসে, তখন ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে যেন অন্য এক সৌন্দর্যে সেজে ওঠে। প্রশস্ত ও আধুনিক সড়ক, দুই পাশে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, সারিবদ্ধ গাছ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ যান চলাচল—সব মিলিয়ে মনে হয়, এটি শুধু একটি মহাসড়ক নয়; এটি একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। নগরজীবনের ব্যস্ততা ও কোলাহল পেছনে ফেলে এই পথে এগোতে এগোতে উপলব্ধি হয়, উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান, যোগাযোগব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
এক সময় এ অঞ্চলে যাতায়াত মানেই ছিল ফেরিঘাটের দীর্ঘ অপেক্ষা, যানজট, অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ। ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী, রোগী—সবার জীবনেই ছিল সময়ের অপচয় ও ভোগান্তি। আজ সেই দৃশ্য ইতিহাস। আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যোগাযোগ সহজ হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল হয়েছে, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাচ্ছে, শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং পর্যটন খাতও নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
যাত্রাপথের একপর্যায়ে দৃষ্টিসীমায় যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পদ্মা সেতু চোখে পড়ে, তখন হৃদয়ে এক অন্যরকম আবেগের জন্ম হয়। বিশাল পদ্মা নদীর বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতু কেবল একটি প্রকৌশল কাঠামো নয়; এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। বহু প্রতিকূলতা, নানা আন্তর্জাতিক বিতর্ক, অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং অসংখ্য চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এই সেতু বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশ চাইলে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে।
পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্তম্ভ যেন উচ্চারণ করে—স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সাহস থাকতে হয়। একটি জাতির উন্নয়নের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম গর্বের সঙ্গে স্মরণ করে। পদ্মা সেতু তেমনই একটি অর্জন। এটি শুধু দুই পাড়কে সংযুক্ত করেনি; সংযুক্ত করেছে মানুষের আশা, সম্ভাবনা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকে।
অস্তগামী সূর্যের সোনালি আলো যখন পদ্মার জলরাশির ওপর পড়ে, তখন প্রকৃতি যেন এক অপূর্ব রূপে ধরা দেয়। নদীর বুকে ভেসে চলা নৌকা, দূরে জেলেদের ব্যস্ততা, মৃদু বাতাসের স্পর্শ এবং সেতুর বিশাল অবয়ব—সব মিলিয়ে মনে হয়, প্রকৃতি ও উন্নয়ন এখানে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন আধুনিক অবকাঠামো প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের জীবনকে সহজ ও সমৃদ্ধ করে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। যুগ যুগ ধরে নদী আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু একই সঙ্গে নদী অনেক সময় যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জও ছিল। পদ্মা সেতু সেই চ্যালেঞ্জকে শক্তিতে রূপান্তর করেছে। আজ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতির মূল প্রবাহের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত হয়েছে।
পদ্মা সেতুর ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান। বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারিত হচ্ছে, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে, পর্যটন বিকশিত হচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন যে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি, পদ্মা সেতু তার বাস্তব উদাহরণ।
তবে উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের দায়িত্বও কম নয়। এই মহাসড়ক, সেতু এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য। উন্নয়নের সুফল তখনই দীর্ঘস্থায়ী হবে, যখন নাগরিক সচেতনতা তার সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাবে।
ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ভ্রমণ করতে করতে মনে হয়, বাংলাদেশ আজ নতুন এক অভিযাত্রায় রয়েছে। প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, কৃষি ও শিল্প—প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ দৃশ্যমান। সামনে আরও অনেক পথ বাকি, অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি এখন অনেক দৃঢ়।
একটি দেশের পরিচয় শুধু তার অতীত দিয়ে নয়, বর্তমানের অর্জন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দিয়েও নির্ধারিত হয়। পদ্মা সেতু সেই স্বপ্নের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এটি প্রমাণ করেছে যে জাতীয় ঐক্য, পরিকল্পনা, দক্ষতা ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে যেকোনো বড় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
পড়ন্ত বিকেলের সেই সফর তাই কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না; এটি ছিল দেশের উন্নয়নের স্পন্দনকে কাছ থেকে অনুভব করার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সেই যাত্রায় উপলব্ধি করেছি—বাংলাদেশ শুধু সবুজ প্রকৃতির দেশ নয়; এটি সম্ভাবনার দেশ, আত্মবিশ্বাসের দেশ, সংগ্রাম ও সাফল্যের দেশ। এই মাটির মানুষ প্রতিকূলতাকে জয় করতে জানে, নতুন স্বপ্ন গড়তে জানে এবং উন্নয়নের পথে অবিচল থাকতে জানে।
আজকের বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে সুশাসন, সততা, জবাবদিহিতা, দক্ষতা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই পদ্মা সেতুর মতো অর্জনগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পরিশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে শান্তি, স্থিতিশীলতা, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। সকল প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপদ থেকে দেশকে হেফাজত করুন। আমাদের মাঝে দেশপ্রেম, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত রাখুন।
বাংলাদেশ আমার অহংকার। পদ্মা সেতু আমাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এই মাটি, এই মানুষ, এই পতাকাই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়।
এম. নজির উল্যাহ
প্রধান নির্বাহী সম্পাদক
সোনালী জমিন মিডিয়া গ্রুপ
নজির উল্যাহ 




















