11:38 pm, Sunday, 25 October 2026

কেন বারবার সাংবাদিকরাই টার্গেট হয়?

সাংবাদিকরা কি তবে এই সমাজের সবচেয়ে সহজ টার্গেট?

প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবার কোনো সাংবাদিক কিংবা গণমাধ্যমকর্মী পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলা, হুমকি, বাধা কিংবা হয়রানির শিকার হলে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে। আর আজকের ঘটনা সেই প্রশ্নটিকে আবারও তীব্র করে তুলেছে।
৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকার ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন সময় টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার মেহেদী হাসান কামরুল এবং ক্যামেরাপার্সন সিফাত শাহরিয়ার। ঘটনার পর চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সংঘর্ষের মধ্যকার আরেকটি ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে এর মধ্যে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি বড় বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।
সাংবাদিক যখন সংঘর্ষের জায়গায় যান, তিনি সেখানে কারও পক্ষ নিতে যান না। তিনি যান কী ঘটছে তা দেখতে, তথ্য সংগ্রহ করতে এবং মানুষের সামনে সেই ঘটনা তুলে ধরতে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো,সংঘর্ষের উত্তাপের মধ্যে সাংবাদিকের ক্যামেরা অনেকের কাছে পক্ষের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। মাইক্রোফোনকে মনে হতে পারে কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র। প্রশ্ন করাকে মনে হতে পারে উসকানি। ছবি তোলাকে মনে হতে পারে বিপদ। আর সংবাদ প্রকাশকে মনে হতে পারে স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান।
এই ভুল ধারণাটিই সাংবাদিকদের ঝুঁকির অন্যতম কারণ।
মিরপুরের ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান কেন হলো, হকারদের অবস্থান কী, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ কেন হলো, সেখানে কার কী ভূমিকা ছিল,এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা সাংবাদিকের কাজ। সাংবাদিক যদি সেখানে না যান, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে জানবেন আসলে কী ঘটেছে?
কিন্তু সেই তথ্য সংগ্রহ করতেই যদি সাংবাদিককে হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই,সংবাদ সংগ্রহের অধিকার কি বাস্তবে নিরাপদ?
আমরা প্রায়ই বলি, সংবাদমাধ্যম সমাজের দর্পণ। কিন্তু সেই দর্পণ যদি ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে সমাজ নিজের চেহারা দেখবে কীভাবে?
একজন রিপোর্টার মাঠে যান খালি হাতে। তার হাতে থাকে মাইক্রোফোন। একজন ভিডিও জার্নালিস্টের হাতে থাকে ক্যামেরা। তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো অস্ত্র নয়,তথ্য।
তাঁরা প্রশ্ন করেন।
তাঁরা ছবি তোলেন।
তাঁরা বক্তব্য নেন।
তাঁরা প্রত্যক্ষ করেন।
তারপর মানুষের সামনে তুলে ধরেন যা তাঁরা দেখেছেন এবং যাচাই করতে পেরেছেন।
এটাই সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
কিন্তু এই স্বাভাবিক কাজটিই যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন শুধু সাংবাদিক নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কারণ সাংবাদিককে আক্রমণ করা মানে শুধু একজন মানুষকে আঘাত করা নয়। এর প্রভাব পড়ে মানুষের জানার অধিকারের ওপরও।
একটি সংঘর্ষের ছবি যদি সাংবাদিক তুলতে না পারেন, একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য যদি নিতে না পারেন, একটি অনিয়মের তথ্য যদি সংগ্রহ করতে না পারেন,তাহলে সেই ঘটনার কতটুকু সত্য মানুষের সামনে পৌঁছাবে?
সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়টি তাই শুধু পেশাগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এটি তথ্যের অবাধ প্রবাহের প্রশ্ন।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার,সাংবাদিকও আইনের ঊর্ধ্বে নন।
একজন সাংবাদিক ভুল করতে পারেন। কোনো সংবাদে তথ্যগত ভুল থাকতে পারে। কোনো প্রতিবেদনের ভাষা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। কারও বক্তব্য অসম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হতে পারে। কোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষ দ্বিমত পোষণ করতে পারে।
এসবের প্রতিকার আছে।
প্রতিবাদ করার অধিকার আছে।
সংশোধন চাওয়ার সুযোগ আছে।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।
গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার পথ আছে।
কিন্তু হামলা কোনো প্রতিকার নয়।
ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া কোনো প্রতিবাদ নয়।
সাংবাদিককে ভয় দেখানো কোনো জবাব নয়।
মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়া কোনো যুক্তি নয়।
কারণ সাংবাদিকের কোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার জবাব হতে হবে তথ্য দিয়ে, যুক্তি দিয়ে এবং আইনসম্মত পথে।
মিরপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে,সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
হকার উচ্ছেদ অভিযান হোক, রাজনৈতিক কর্মসূচি হোক, শ্রমিক আন্দোলন হোক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান হোক কিংবা কোনো উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা,প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে থাকেন।
কারণ তাঁদের কাজই হলো ঘটনাস্থলে থাকা।
তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়। এটি তাদের পেশাগত কাজের প্রয়োজনীয় শর্ত।
বিশ্বের যেকোনো জায়গায় সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ করা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ঝুঁকি থাকলেই সাংবাদিকদের মাঠে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া যায় না। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সাংবাদিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন।
পুলিশের দায়িত্ব এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সংঘর্ষের সময় সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সাংবাদিকরা যেন নিরাপদ দূরত্বে থেকে কাজ করতে পারেন, তাঁদের পেশাগত পরিচয় যেন বিবেচনায় নেওয়া হয় এবং তাঁদের ওপর কোনো পক্ষের হামলা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়,এগুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
একইভাবে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন কিংবা যেকোনো পক্ষেরও দায়িত্ব আছে সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখার।
সাংবাদিক আপনার বিরুদ্ধে লিখতে পারেন। আপনার বক্তব্যের সমালোচনা করতে পারেন। আপনার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি আপনার শত্রু।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্ন থাকবে।
সমালোচনা থাকবে।
মতপার্থক্য থাকবে।
কিন্তু মতপার্থক্যের জবাব সহিংসতা হতে পারে না।
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে কখনো কখনো এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে সাংবাদিককে বলা হয়,এই খবর করবেন না, ওই ছবি তুলবেন না, এটা প্রচার করবেন না।
এরপর আসে হুমকি।
তারপর আসে চাপ।
আর কখনো কখনো পরিস্থিতি গড়ায় হামলা পর্যন্ত।
এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।
কারণ সাংবাদিক যদি কোনো ঘটনা দেখেও তা প্রকাশ করতে ভয় পান, তাহলে সংবাদমাধ্যমের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
একজন সাংবাদিক যদি মাঠে যাওয়ার আগে ভাবেন,আমি ফিরে আসতে পারব তো?
একজন ক্যামেরাপার্সন যদি ক্যামেরা চালু করার আগে ভাবেন—কেউ ক্যামেরাটি কেড়ে নেবে না তো?
একজন রিপোর্টার যদি প্রশ্ন করার আগে ভাবেন,এই প্রশ্নের কারণে আমার ওপর হামলা হবে না তো?
তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ কোথায়?
আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সাংবাদিক সংগঠনের নয়। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি আইনগত ও প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো নাগরিক—বিশেষ করে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত একজন সাংবাদিক—সহিংসতার শিকার হলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়।
অভিযোগ সত্য হলে অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখানে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা অন্য কোনো পরিচয় যেন আইনের প্রয়োগকে প্রভাবিত না করে—এটাই প্রত্যাশা।
কারণ হামলাকারী যদি মনে করেন সাংবাদিককে আঘাত করার পরও সহজে পার পাওয়া যাবে, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে।
অন্যদিকে একটি হামলার ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনসম্মত ব্যবস্থা অন্যদের জন্যও একটি স্পষ্ট বার্তা তৈরি করে—সাংবাদিকের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়।
শুধু সাংবাদিক নয়, সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোরও কিছু দায়িত্ব আছে।
কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে সংগঠনগুলোর উচিত দল-মত-পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
আজ যদি সময় টেলিভিশনের একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হন, কাল অন্য কোনো টেলিভিশনের সাংবাদিক আক্রান্ত হতে পারেন। আজ যদি একজন ক্যামেরাপার্সনের ক্যামেরা ভাঙা হয়, কাল অন্য কোনো ভিডিও সাংবাদিকের ক্যামেরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা তাই ব্যক্তিগত বিষয় নয়।
এটি পেশাগত বিষয়।
এটি গণমাধ্যমের বিষয়।
এটি মানুষের জানার অধিকারের বিষয়।
তবে সাংবাদিকদের নিজেদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা সাংবাদিকের দায়িত্ব। তথ্য যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করা, ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদে পরিণত করা, অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাষা ব্যবহার করা হলে সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই সাংবাদিকের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে।
একজন সাংবাদিক যত বেশি পেশাগতভাবে নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল হবেন, তার অবস্থান তত শক্তিশালী হবে।
কিন্তু সাংবাদিকতার কোনো ভুলের অজুহাতেও সহিংসতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ভুলের জবাব সংশোধন।
অভিযোগের জবাব প্রতিবাদ।
মানহানির অভিযোগের জবাব আইন।
আর অপরাধের অভিযোগের জবাব তদন্ত ও বিচার।
হামলার জবাব হামলা নয়।
৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০-এর ঘটনা তাই আমাদের নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। হকারদের জীবিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। উচ্ছেদ অভিযানের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
এসব প্রশ্নের উত্তর সংবাদমাধ্যমের কাজের মাধ্যমেই মানুষের সামনে আসবে।
আর সেই সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা যদি হামলার শিকার হন, তাহলে বিষয়টি শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না।
এটি সাংবাদিকতার পরিবেশের প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নও ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকের ওপর হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তারা জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছে।
এই দাবির সঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন যুক্ত হওয়া প্রয়োজন,সাংবাদিকরা কতদিন এভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবেন?
আমরা সাংবাদিকরা কারও বিশেষ সুবিধা চাই না।
আমরা চাই না আইনের বাইরে কোনো নিরাপত্তা।
আমরা চাই না আমাদের ভুল হলে আমাদের জবাবদিহি না থাকুক।
আমরা শুধু চাই,আমরা যেন নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারি।
আমরা চাই, ক্যামেরা হাতে একজন সাংবাদিককে যেন নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে কাজ করতে না হয়।
আমরা চাই, কোনো রিপোর্টার যেন প্রশ্ন করার আগে সম্ভাব্য হামলার কথা চিন্তা না করেন।
আমরা চাই, কোনো ক্যামেরাপার্সন যেন মানুষের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা ধারণ করতে গিয়ে নিজের ক্যামেরা ও নিজের জীবন,দুটির নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত না থাকেন।
কারণ সাংবাদিক কোনো পক্ষের শত্রু নন।
তিনি সমাজের ঘটনাগুলোর সাক্ষী।
তিনি প্রশ্ন করেন, যাতে মানুষ উত্তর পায়।
তিনি ছবি ধারণ করেন, যাতে ঘটনা অস্বীকার করা না যায়।
তিনি সংবাদ প্রকাশ করেন, যাতে মানুষ জানতে পারে।
তাই সাংবাদিককে নিরাপদ রাখা মানে শুধু একজন সাংবাদিককে নিরাপদ রাখা নয়, তথ্যকে নিরাপদ রাখা, প্রশ্নকে নিরাপদ রাখা এবং মানুষের জানার অধিকারকে নিরাপদ রাখা।
আজ মিরপুরে কামরুল হাসান ও সিফাত শাহরিয়ারের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। আগামীকাল অন্য কোথাও অন্য কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হতে পারেন। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতিটি ঘটনার পর শুধু বিবৃতি দেব, প্রতিবাদ জানাব এবং কয়েক দিন পর সব ভুলে যাব? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে সাংবাদিককে আক্রমণ করার আগে হামলাকারীকে অন্তত ভাবতে হবে—এর পরিণতি কী? জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু প্রতিবাদ করে সমস্যার সমাধান হবে না।
আমাদের প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত।
প্রয়োজন আইনের প্রয়োগ।
প্রয়োজন সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ।
প্রয়োজন সাংবাদিকতার প্রতি সামাজিক সম্মান।
আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—সাংবাদিককে প্রতিপক্ষ নয়, গণতান্ত্রিক সমাজের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা।
আমরা নিরাপদে কাজ করতে চাই।
আমরা নির্বিঘ্নে সংবাদ সংগ্রহ করতে চাই।
আমরা মানুষের কথা বলতে চাই।
আমরা প্রশ্ন করতে চাই।
আমরা সত্য তুলে ধরতে চাই।
কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই না।
কিন্তু সত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে যদি বারবার সাংবাদিককেই টার্গেট করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, কেন বারবার সাংবাদিকরাই টার্গেট হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সাংবাদিকদের নয়, রাষ্ট্রের কাছেও চাই।
কারণ একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়,এটি একটি সমাজের সত্য জানার অধিকারকে নিরাপদ রাখা।
আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
লেখক পরিচিতিঃ
এইচ. এন. কামরুল ইসলাম
সাংবাদিক (কর্মরত মোহনা টেলিভিশন) কলাম লেখক, প্রতিষ্ঠাতা মাগুরা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলাদেশ সংবাদিক সংস্থা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ঈশ্বরদীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জমি দখলের চেষ্টা

কেন বারবার সাংবাদিকরাই টার্গেট হয়?

Update Time : 07:02:27 pm, Thursday, 1 October 2026

সাংবাদিকরা কি তবে এই সমাজের সবচেয়ে সহজ টার্গেট?

প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবার কোনো সাংবাদিক কিংবা গণমাধ্যমকর্মী পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলা, হুমকি, বাধা কিংবা হয়রানির শিকার হলে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে। আর আজকের ঘটনা সেই প্রশ্নটিকে আবারও তীব্র করে তুলেছে।
৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকার ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন সময় টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার মেহেদী হাসান কামরুল এবং ক্যামেরাপার্সন সিফাত শাহরিয়ার। ঘটনার পর চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সংঘর্ষের মধ্যকার আরেকটি ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে এর মধ্যে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি বড় বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।
সাংবাদিক যখন সংঘর্ষের জায়গায় যান, তিনি সেখানে কারও পক্ষ নিতে যান না। তিনি যান কী ঘটছে তা দেখতে, তথ্য সংগ্রহ করতে এবং মানুষের সামনে সেই ঘটনা তুলে ধরতে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো,সংঘর্ষের উত্তাপের মধ্যে সাংবাদিকের ক্যামেরা অনেকের কাছে পক্ষের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। মাইক্রোফোনকে মনে হতে পারে কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র। প্রশ্ন করাকে মনে হতে পারে উসকানি। ছবি তোলাকে মনে হতে পারে বিপদ। আর সংবাদ প্রকাশকে মনে হতে পারে স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান।
এই ভুল ধারণাটিই সাংবাদিকদের ঝুঁকির অন্যতম কারণ।
মিরপুরের ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান কেন হলো, হকারদের অবস্থান কী, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ কেন হলো, সেখানে কার কী ভূমিকা ছিল,এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা সাংবাদিকের কাজ। সাংবাদিক যদি সেখানে না যান, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে জানবেন আসলে কী ঘটেছে?
কিন্তু সেই তথ্য সংগ্রহ করতেই যদি সাংবাদিককে হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই,সংবাদ সংগ্রহের অধিকার কি বাস্তবে নিরাপদ?
আমরা প্রায়ই বলি, সংবাদমাধ্যম সমাজের দর্পণ। কিন্তু সেই দর্পণ যদি ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে সমাজ নিজের চেহারা দেখবে কীভাবে?
একজন রিপোর্টার মাঠে যান খালি হাতে। তার হাতে থাকে মাইক্রোফোন। একজন ভিডিও জার্নালিস্টের হাতে থাকে ক্যামেরা। তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো অস্ত্র নয়,তথ্য।
তাঁরা প্রশ্ন করেন।
তাঁরা ছবি তোলেন।
তাঁরা বক্তব্য নেন।
তাঁরা প্রত্যক্ষ করেন।
তারপর মানুষের সামনে তুলে ধরেন যা তাঁরা দেখেছেন এবং যাচাই করতে পেরেছেন।
এটাই সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
কিন্তু এই স্বাভাবিক কাজটিই যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন শুধু সাংবাদিক নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কারণ সাংবাদিককে আক্রমণ করা মানে শুধু একজন মানুষকে আঘাত করা নয়। এর প্রভাব পড়ে মানুষের জানার অধিকারের ওপরও।
একটি সংঘর্ষের ছবি যদি সাংবাদিক তুলতে না পারেন, একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য যদি নিতে না পারেন, একটি অনিয়মের তথ্য যদি সংগ্রহ করতে না পারেন,তাহলে সেই ঘটনার কতটুকু সত্য মানুষের সামনে পৌঁছাবে?
সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়টি তাই শুধু পেশাগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এটি তথ্যের অবাধ প্রবাহের প্রশ্ন।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার,সাংবাদিকও আইনের ঊর্ধ্বে নন।
একজন সাংবাদিক ভুল করতে পারেন। কোনো সংবাদে তথ্যগত ভুল থাকতে পারে। কোনো প্রতিবেদনের ভাষা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। কারও বক্তব্য অসম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হতে পারে। কোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষ দ্বিমত পোষণ করতে পারে।
এসবের প্রতিকার আছে।
প্রতিবাদ করার অধিকার আছে।
সংশোধন চাওয়ার সুযোগ আছে।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।
গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার পথ আছে।
কিন্তু হামলা কোনো প্রতিকার নয়।
ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া কোনো প্রতিবাদ নয়।
সাংবাদিককে ভয় দেখানো কোনো জবাব নয়।
মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়া কোনো যুক্তি নয়।
কারণ সাংবাদিকের কোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার জবাব হতে হবে তথ্য দিয়ে, যুক্তি দিয়ে এবং আইনসম্মত পথে।
মিরপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে,সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
হকার উচ্ছেদ অভিযান হোক, রাজনৈতিক কর্মসূচি হোক, শ্রমিক আন্দোলন হোক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান হোক কিংবা কোনো উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা,প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে থাকেন।
কারণ তাঁদের কাজই হলো ঘটনাস্থলে থাকা।
তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়। এটি তাদের পেশাগত কাজের প্রয়োজনীয় শর্ত।
বিশ্বের যেকোনো জায়গায় সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ করা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ঝুঁকি থাকলেই সাংবাদিকদের মাঠে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া যায় না। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সাংবাদিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন।
পুলিশের দায়িত্ব এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সংঘর্ষের সময় সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সাংবাদিকরা যেন নিরাপদ দূরত্বে থেকে কাজ করতে পারেন, তাঁদের পেশাগত পরিচয় যেন বিবেচনায় নেওয়া হয় এবং তাঁদের ওপর কোনো পক্ষের হামলা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়,এগুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
একইভাবে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন কিংবা যেকোনো পক্ষেরও দায়িত্ব আছে সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখার।
সাংবাদিক আপনার বিরুদ্ধে লিখতে পারেন। আপনার বক্তব্যের সমালোচনা করতে পারেন। আপনার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি আপনার শত্রু।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্ন থাকবে।
সমালোচনা থাকবে।
মতপার্থক্য থাকবে।
কিন্তু মতপার্থক্যের জবাব সহিংসতা হতে পারে না।
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে কখনো কখনো এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে সাংবাদিককে বলা হয়,এই খবর করবেন না, ওই ছবি তুলবেন না, এটা প্রচার করবেন না।
এরপর আসে হুমকি।
তারপর আসে চাপ।
আর কখনো কখনো পরিস্থিতি গড়ায় হামলা পর্যন্ত।
এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।
কারণ সাংবাদিক যদি কোনো ঘটনা দেখেও তা প্রকাশ করতে ভয় পান, তাহলে সংবাদমাধ্যমের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
একজন সাংবাদিক যদি মাঠে যাওয়ার আগে ভাবেন,আমি ফিরে আসতে পারব তো?
একজন ক্যামেরাপার্সন যদি ক্যামেরা চালু করার আগে ভাবেন—কেউ ক্যামেরাটি কেড়ে নেবে না তো?
একজন রিপোর্টার যদি প্রশ্ন করার আগে ভাবেন,এই প্রশ্নের কারণে আমার ওপর হামলা হবে না তো?
তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ কোথায়?
আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সাংবাদিক সংগঠনের নয়। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি আইনগত ও প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো নাগরিক—বিশেষ করে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত একজন সাংবাদিক—সহিংসতার শিকার হলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়।
অভিযোগ সত্য হলে অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখানে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা অন্য কোনো পরিচয় যেন আইনের প্রয়োগকে প্রভাবিত না করে—এটাই প্রত্যাশা।
কারণ হামলাকারী যদি মনে করেন সাংবাদিককে আঘাত করার পরও সহজে পার পাওয়া যাবে, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে।
অন্যদিকে একটি হামলার ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনসম্মত ব্যবস্থা অন্যদের জন্যও একটি স্পষ্ট বার্তা তৈরি করে—সাংবাদিকের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়।
শুধু সাংবাদিক নয়, সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোরও কিছু দায়িত্ব আছে।
কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে সংগঠনগুলোর উচিত দল-মত-পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
আজ যদি সময় টেলিভিশনের একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হন, কাল অন্য কোনো টেলিভিশনের সাংবাদিক আক্রান্ত হতে পারেন। আজ যদি একজন ক্যামেরাপার্সনের ক্যামেরা ভাঙা হয়, কাল অন্য কোনো ভিডিও সাংবাদিকের ক্যামেরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা তাই ব্যক্তিগত বিষয় নয়।
এটি পেশাগত বিষয়।
এটি গণমাধ্যমের বিষয়।
এটি মানুষের জানার অধিকারের বিষয়।
তবে সাংবাদিকদের নিজেদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা সাংবাদিকের দায়িত্ব। তথ্য যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করা, ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদে পরিণত করা, অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাষা ব্যবহার করা হলে সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই সাংবাদিকের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে।
একজন সাংবাদিক যত বেশি পেশাগতভাবে নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল হবেন, তার অবস্থান তত শক্তিশালী হবে।
কিন্তু সাংবাদিকতার কোনো ভুলের অজুহাতেও সহিংসতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ভুলের জবাব সংশোধন।
অভিযোগের জবাব প্রতিবাদ।
মানহানির অভিযোগের জবাব আইন।
আর অপরাধের অভিযোগের জবাব তদন্ত ও বিচার।
হামলার জবাব হামলা নয়।
৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০-এর ঘটনা তাই আমাদের নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। হকারদের জীবিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। উচ্ছেদ অভিযানের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
এসব প্রশ্নের উত্তর সংবাদমাধ্যমের কাজের মাধ্যমেই মানুষের সামনে আসবে।
আর সেই সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা যদি হামলার শিকার হন, তাহলে বিষয়টি শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না।
এটি সাংবাদিকতার পরিবেশের প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নও ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকের ওপর হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তারা জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছে।
এই দাবির সঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন যুক্ত হওয়া প্রয়োজন,সাংবাদিকরা কতদিন এভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবেন?
আমরা সাংবাদিকরা কারও বিশেষ সুবিধা চাই না।
আমরা চাই না আইনের বাইরে কোনো নিরাপত্তা।
আমরা চাই না আমাদের ভুল হলে আমাদের জবাবদিহি না থাকুক।
আমরা শুধু চাই,আমরা যেন নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারি।
আমরা চাই, ক্যামেরা হাতে একজন সাংবাদিককে যেন নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে কাজ করতে না হয়।
আমরা চাই, কোনো রিপোর্টার যেন প্রশ্ন করার আগে সম্ভাব্য হামলার কথা চিন্তা না করেন।
আমরা চাই, কোনো ক্যামেরাপার্সন যেন মানুষের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা ধারণ করতে গিয়ে নিজের ক্যামেরা ও নিজের জীবন,দুটির নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত না থাকেন।
কারণ সাংবাদিক কোনো পক্ষের শত্রু নন।
তিনি সমাজের ঘটনাগুলোর সাক্ষী।
তিনি প্রশ্ন করেন, যাতে মানুষ উত্তর পায়।
তিনি ছবি ধারণ করেন, যাতে ঘটনা অস্বীকার করা না যায়।
তিনি সংবাদ প্রকাশ করেন, যাতে মানুষ জানতে পারে।
তাই সাংবাদিককে নিরাপদ রাখা মানে শুধু একজন সাংবাদিককে নিরাপদ রাখা নয়, তথ্যকে নিরাপদ রাখা, প্রশ্নকে নিরাপদ রাখা এবং মানুষের জানার অধিকারকে নিরাপদ রাখা।
আজ মিরপুরে কামরুল হাসান ও সিফাত শাহরিয়ারের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। আগামীকাল অন্য কোথাও অন্য কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হতে পারেন। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতিটি ঘটনার পর শুধু বিবৃতি দেব, প্রতিবাদ জানাব এবং কয়েক দিন পর সব ভুলে যাব? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে সাংবাদিককে আক্রমণ করার আগে হামলাকারীকে অন্তত ভাবতে হবে—এর পরিণতি কী? জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু প্রতিবাদ করে সমস্যার সমাধান হবে না।
আমাদের প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত।
প্রয়োজন আইনের প্রয়োগ।
প্রয়োজন সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ।
প্রয়োজন সাংবাদিকতার প্রতি সামাজিক সম্মান।
আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—সাংবাদিককে প্রতিপক্ষ নয়, গণতান্ত্রিক সমাজের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা।
আমরা নিরাপদে কাজ করতে চাই।
আমরা নির্বিঘ্নে সংবাদ সংগ্রহ করতে চাই।
আমরা মানুষের কথা বলতে চাই।
আমরা প্রশ্ন করতে চাই।
আমরা সত্য তুলে ধরতে চাই।
কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই না।
কিন্তু সত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে যদি বারবার সাংবাদিককেই টার্গেট করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, কেন বারবার সাংবাদিকরাই টার্গেট হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সাংবাদিকদের নয়, রাষ্ট্রের কাছেও চাই।
কারণ একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়,এটি একটি সমাজের সত্য জানার অধিকারকে নিরাপদ রাখা।
আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
লেখক পরিচিতিঃ
এইচ. এন. কামরুল ইসলাম
সাংবাদিক (কর্মরত মোহনা টেলিভিশন) কলাম লেখক, প্রতিষ্ঠাতা মাগুরা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলাদেশ সংবাদিক সংস্থা।