মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এখন এক নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে। একদিকে সামরিক শক্তির আস্ফালন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে চলছে সূক্ষ্ম ‘মাইন্ড গেইম’। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সূত্রগুলো (CGTN, AJU Press) বলছে, ইরান সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি ত্রি-স্তরীয় (Three-step) শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাবকে বিশ্লেষকরা তেহরানের এক কৌশলগত ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে দেখছেন, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ইরানের ত্রি-স্তরীয় প্রস্তাব: নেপথ্যে কী?
ইরানের এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তাদের মূল বক্তব্য হলো—দশকের পর দশক ধরে চলা এই সংকট একদিনের আলোচনায় সমাধান সম্ভব নয়। তাই তারা তিনটি ধাপ প্রস্তাব করেছে:
১. প্রথম ধাপ (সামরিক উত্তেজনা প্রশমন): ইরান হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করবে, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নিতে হবে। মূলত, কোনো রকম হুমকি ছাড়া আলোচনার পরিবেশ তৈরি করাই এই ধাপের লক্ষ্য।
২. দ্বিতীয় ধাপ (হরমুজ প্রণালীর স্থায়ী সমাধান): ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো তৈরি করা হবে। (সূত্র: TASS, গ্লোবাল টাইমস)।
৩. তৃতীয় ধাপ (নিউক্লিয়ার ইস্যু): প্রথম দুই ধাপ সফল হলে তবেই ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে টেবিলে বসবে। (সূত্র: অ্যাক্সিওস)।
তেহরানের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ও ট্রাম্পের সংকট
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এখানে অত্যন্ত চতুর চাল চেলেছে। যদি প্রথম দুই ধাপে হরমুজ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তবে যুদ্ধের দামামা অনেকটাই থেমে যাবে। একবার স্থিতিশীলতা ফিরে আসলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পুনরায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে দর কষাকষি করতে পারবে।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এখন চতুর্মুখী চাপ। একদিকে গাল্ফ দেশগুলোর নেতারা বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়ার ভয়ে ট্রাম্পকে ফোন করছেন, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন সরাসরি ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের স্বার্থ রক্ষায় সর্বাত্মক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছেন (সূত্র: গ্লোবাল টাইমস)।
অর্থনৈতিক হিসাব ও পেট্রো-ডলারের ভবিষ্যৎ
ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধের খরচ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের মতো গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, এই সংঘাত দীর্ঘমেয়াদী হলে মার্কিন কোষাগার থেকে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। ইতোমধ্যে এই সংকটে ২৫ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলেছে ওয়াশিংটন।
সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পেট্রো-ডলার’। ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনে ডলারের পরিবর্তে চীনা ইউয়ানের মতো বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ করে দিচ্ছে। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডলারের একাধিপত্যের জন্য বড় হুমকি।
শেষ কথা: কূটনীতি না কি সংঘাত?
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হুমকির মুখে তারা কোনো আলোচনায় যাবে না। আর এই কারণেই হয়তো গত কয়েকদিন ধরে ট্রাম্পের কণ্ঠে আগের মতো আক্রমণাত্মক সুর শোনা যাচ্ছে না। ইরানের সম্মতিতে জাপানি ট্যাংকার হরমুজ পার হওয়া এবং ইরানের নিজস্ব কৌশলে মার্কিন ব্লকেড ফাঁকি দেওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, তেহরান মাঠের লড়াই এবং টেবিলের লড়াই—উভয় ক্ষেত্রেই প্রস্তুত।
ট্রাম্প কি এখন তার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি বজায় রাখবেন, নাকি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতি এড়াতে ইরানের এই ত্রি-স্তরীয় প্রস্তাব মেনে নিয়ে কূটনীতির পথে হাঁটবেন? পুরো বিশ্বের চোখ এখন হোয়াইট হাউসের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নাসির উদ্দিন সিকদার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোঃ ফজলুল হক
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : লোকমান হোসেন
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আল মাহমুদ
মফস্বল সম্পাদক : তাহমিনা সুলতানা
প্রধান কার্যালয় : ৮৪/৬ নয়া পল্টন ১০০০
Email:sobujbiplob625@gmail.com
phone:০১৯১১-১৪২০৯১
দুঃখিত আপনি এই সাইট থেকে কন্টেন কপি করতে পারবেন না। দৈনিক সবুজ বিপ্লব ওয়েব সাইট থেকে কন্টেন কপি করা আইনানুক অপরাধ। ধন্যবাদ